চ্যাটবটের জালে মানবমন?

চ্যাটবটের জালে মানবমন?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট ক্রমেই তীব্র আকার নিচ্ছে। আর এই পরিস্থিতিকে পুঁজি করে বহু প্রযুক্তি কোম্পানি এআই-চালিত চ্যাটবটকে (যেমন, রেপ্লিকা, ওয়েবট এবং ইউপার প্রভৃতি অ্যাপ্লিকেশন) এক সহজ, সস্তা ও ব্যাপকভাবে প্রয়োগযোগ্য সমাধান হিসেবে বাজারজাত করে মুনাফা লোটার চেষ্টা প্রাণপণে চালিয়ে যাচ্ছে। এগুলো নিজেদের এক অন্তহীন ধৈর্যশীল শ্রোতা, ভালোমন্দ নির্বিশেষে বন্ধু এবং ডেটাভিত্তিক ব্যক্তিগত সহায়তার উৎস বলে দাবি করে। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে এই প্রযুক্তিগত চমক আসলে বহু ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। মানসিক স্বাস্থ্যের জটিল বাস্তবতা এমন সরল যান্ত্রিক সমাধানে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
এই গবেষণায় ফুটে ওঠা প্রথম বড় উদ্বেগের জায়গা হলো—এসব চ্যাটবট মানুষের নিঃসঙ্গতা কমানোর পরিবর্তে আরও বাড়িয়ে দেয়। এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের ২০২৫ সালের এক বৃহৎ গবেষণায় দেখা যায়—যেসব ব্যবহারকারী চ্যাটবটের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান, তাদের মধ্যে নিঃসঙ্গতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং এআই-এর ওপর মানসিক নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কৃত্রিম সঙ্গের প্রতিশ্রুতি মানুষকে বাস্তব মানবসম্পর্ক থেকে দূরে সরিয়ে, এক ধরনের নকল ঘনিষ্ঠতার জালে জড়িয়ে ফেলে।
দ্বিতীয়ত, চ্যাটবটগুলোর নকশায় এমন কিছু আচরণগত কৌশল থাকে যা ব্যবহারকারীকে অচেতনভাবে আসক্ত করে তোলে। গবেষকরা এটিকে “সাইকোফ্যান্সি” (তোষামোদ/ অতিরিক্ত সমর্থনমূলক আচরণ) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।এক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর প্রতিটি অনুভূতি, ধারণা ও সিদ্ধান্তকে যাচাই-বাছাই না করেই সমর্থন করে এআই। এটি এক ধরনের অস্বচ্ছ “ডার্ক প্যাটার্ন”, যার লক্ষ্য ব্যবহারকারীকে দীর্ঘ সময় ধরে আকৃষ্ট করে রাখা। এর ফলে ব্যবহারকারী ও চ্যাটবট একসঙ্গে এমন এক বদ্ধচক্রে ঢুকে পড়ে, যেখানে ভুল ধারণা, কল্পিত সম্পর্ক বা বিপজ্জনক চিন্তাভাবনা আরও গভীর হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো সংকটমুহূর্তে চ্যাটবটগুলোর অক্ষমতা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে জনপ্রিয় থেরাপি চ্যাটবটগুলোর অনেকগুলোই আত্মহত্যার ইঙ্গিতের মতো গুরুতর সমস্যাও শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়। কিছু ক্ষেত্রে তারা এমন সব কথোপকথনকে উৎসাহিত করে, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। শিশু-তরুণদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি আরও তীব্র। “ফেক ফ্রেন্ড” রিপোর্টে দেখা গেছে, এই বয়সের ব্যবহারকারীরা অর্ধেকের বেশি সময়েই ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়।
এই প্রযুক্তিগুলোর আরেকটি মৌলিক সমস্যা হলো গোপনীয়তা। ব্যবহারকারীরা নিতান্ত ব্যক্তিগত কথা চ্যাটবটের সঙ্গে ভাগ করছেন, আর সেই তথ্য কোম্পানির ডেটাবেসে জমা হয়ে অ্যালগরিদম প্রশিক্ষণ বা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যক্তিগত কষ্টকে ডেটা-পণ্য হিসেবে পরিণত করার অর্থ এক ধরনের মানবিক অবমূল্যায়ন বা নৈতিক সংকট তৈরি করা।
এই গবেষণা সার্বিকভাবে দাবি করে যে চ্যাটবট-ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তিটাই মূলত ভ্রান্ত। এগুলো মানুষের সহায়তার বদলে তাদের বিচ্ছিন্নতা, বিভ্রম ও নির্ভরতা বাড়াচ্ছে । কোনো প্রযুক্তিই মানবিক সম্পর্ক, সামাজিক সহায়তা এবং পেশাদার যত্নের বিকল্প হতে পারে না। বরং ভুল ব্যবহারে এআই চ্যাটবট মানসিক সংকটের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
সুত্র: Chatbots Deepen the Mental Health Crisis by A.T. Kingsmith, 30th October,2025.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 − seven =