শামুক বিলুপ্তি ও দ্বীপের জীববৈচিত্র্য

শামুক বিলুপ্তি ও দ্বীপের জীববৈচিত্র্য

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

নিশ্চুপে একটা দ্বীপের জীববৈচিত্র্য কতটা ভেঙে পড়ছে তার সবচেয়ে নির্মম সূচক হতে পারে স্থলচর শামুক। ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই অ্যাট মানোয়ার জীববিজ্ঞানী রবার্ট কাউইয়ের নেতৃত্বে প্রকাশিত এক বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা বলছে, এই পতন কেবলই উদ্বেগজনক নয়, ধ্বংসাত্মক। উচ্চ আগ্নেয় দ্বীপগুলিতে স্থলচর শামুকের বিলুপ্তির হার ৩০ থেকে বেড়ে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, তীব্রতার দিক থেকেও তারা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাণীগোষ্ঠীগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

গবেষণাটি বৈশ্বিক হলেও এর মূল কেন্দ্রটি হল হাওয়াই ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ। কারণ , আর কোথাও এত বিপুল সংখ্যক শামুক প্রজাতি হারিয়ে যায়নি। এটা সেই সব বাস্তুতন্ত্রের ভেঙে পড়ার দলিল, যেগুলো একসময় ছিল বিবর্তনের পরীক্ষাগার। বিচ্ছিন্ন ভূগোল, সীমিত শত্রু আর দীর্ঘ সময়, এই তিনের সংমিশ্রণে দ্বীপগুলো জন্ম দিয়েছিল অসংখ্য একক, অদ্বিতীয় প্রজাতির। কিন্তু মানুষ সেখানে ঢুকতেই সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। অমেরুদণ্ডী প্রাণীর বিলুপ্তি নথিভুক্ত করা কঠিন। কারণ, মানুষ জানতে পারার আগেই বহু প্রজাতি হারিয়ে যায়। কিন্তু শামুকের একটি অদ্ভুত সুবিধা হল তার খোলস। শামুক মারা গেলে তার খোলস মাটিতে দশক, কখনও শতাব্দী ধরে টিকে থাকে। সময়ের সঙ্গে এই মৃত খোলস জমে তৈরি হয় ‘খোলা ভাণ্ডার’। এ এক ধরনের প্রাকৃতিক মহাফেজখানা। ফরাসি পলিনেশিয়ার গ্যাম্বিয়ার দ্বীপপুঞ্জে এই ‘খোলা ভাণ্ডার’-ই শামুক-বৈচিত্র্যর হদিশ দেয়, যা জীবিত অবস্থায় বিজ্ঞানীদের চোখেই পড়েনি। সমস্যা এখানেই শেষ নয়। বহু দ্বীপ এতটাই দুর্গম যে সেখানে শামুক নিয়ে নিয়মিত সমীক্ষা করা হয় না। বিশ্বব্যাপী সংরক্ষণ আলোচনায় স্থলচর শামুক প্রায় অদৃশ্য। ফলে বহু প্রজাতির সংরক্ষণ- পরিস্থিতির তথ্য পুরনো, ভুল, কিংবা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অর্থাৎ আমরা শুধু শামুক হারাচ্ছি না, আমরা হিসেব রাখতেও ব্যর্থ হচ্ছি। সব বিলুপ্তিই অবশ্য আধুনিক নয়। শেষ বরফযুগের সময় এবং পরবর্তী কালে জলবায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের ওঠানামায় বালিয়াড়ি তৈরি হয়ে বহু প্রজাতি চাপা পড়েছিল। ও আহু দ্বীপে আজও কা’য়েনা পয়েন্টের পথে সেই শামুক জীবাশ্ম চোখে পড়ে। কিন্তু সে বিলুপ্তি ছিল ধীর, সহস্রাব্দ জুড়ে বিস্তৃত। আধুনিক বিপর্যয়ের চরিত্র আলাদা। এটা দ্রুত, আক্রমণাত্মক এবং মানবসৃষ্ট। প্রথম আঘাত আসে বন উজাড় ও আবাসস্থল ধ্বংসের মাধ্যমে। শামুক নির্ভর করে আর্দ্র, স্থিতিশীল ক্ষুদ্র পরিবেশের উপর। যা রাস্তা, চাষ, শহরায়নের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়ে। তারপর আসে চূড়ান্ত ধাক্কা। আগ্রাসী প্রজাতির ইঁদুর তো আছেই, তার সাথে রয়েছে পরিকল্পিত ভুল। অন্য শামুক দমন করতে আনা হয় রোজি উলফ স্নেইল (Euglandina) আর নিউ গিনি ফ্ল্যাটওয়ার্ম (Platydemus manokwari)। দুটিই দক্ষ শামুক-শিকারি, আর দুটোই আজ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের কসাই। হাওয়াইয়ের চিত্রই সবচেয়ে ভয়াবহ। এখানে একসময় অন্তত ৭৫০টি স্থলচর শামুক প্রজাতি ছিল। কিন্তু আজ হয়তো তার মাত্র ১০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেঁচে আছে। প্রতিটি বিলুপ্তি মানে একটি একক বিবর্তনীয় পরীক্ষার সমাপ্তি, পুনরাবৃত্তির সুযোগ ছাড়াই। জলবায়ু পরিবর্তন এখনও সরাসরি বহু শামুক বিলুপ্তির কারণ নয়, কিন্তু বিপদটা স্পষ্ট। পাহাড়ি ঠান্ডা পরিবেশের প্রজাতির জন্য উপরে উঠে বাঁচার একটি শেষ সীমা আছে। সেই সীমা পেরোলেই আর যাওয়ার জায়গা নেই। তবু সব শেষ হয়ে যায়নি। হাওয়াই, সোসাইটি দ্বীপপুঞ্জ, ওগাসাওয়ারা, বারমুডা, মাদেইরার ডেজার্টাস কিংবা মাস্কারিন দ্বীপপুঞ্জে সংরক্ষণ কর্মসূচি চলছে। বনে আগ্রাসী শিকারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন, তাই বহু উদ্যোগ নির্ভর করছে ঘরবন্দি প্রজননের ওপর। তবে এটা স্থায়ী সমাধান নয়। তবু চেষ্টা রাখতে হবে যাতে শামুকের তালিকাটা আর দ্রুত ছোট না হয়ে যায়।

 

সূত্র: Devastation of island biodiversity: a land snail perspective; The Royal Society

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen + thirteen =