শুক্রগ্রহের উলট পুরাণ রহস্য 

শুক্রগ্রহের উলট পুরাণ রহস্য 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৯ জুন, ২০২৬

শুক্রগ্রহে একটি দিন এক বছরের চেয়েও বড়। সৌরজগতের গ্রহগুলোর মধ্যে এই দ্বিতীয় গ্রহটি এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম। আমরা তো জানি, পৃথিবীর সাপেক্ষে এক দিন এক বছরের তুলনায় অনেক ছোট। কিন্তু শুক্রগ্রহে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো । সেখানে একটি পূর্ণ দিন বছরের চেয়েও দীর্ঘ। এমন এক অদ্ভুত তথ্য বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করছিল এতদিন। এই তথ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে আকর্ষণীয় এক বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা।

শুক্রগ্রহ নিজের অক্ষের চারদিকে অত্যন্ত ধীর গতিতে ঘোরে। একবার সম্পূর্ণ আবর্তন শেষ করতে তার সময় লাগে প্রায় ২৪৩ পার্থিব দিবস। অথচ সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে লাগে মাত্র ২২৫ পার্থিব দিবস। অর্থাৎ, শুক্রগ্রহের একটি আবর্তন সম্পন্ন হওয়ার আগেই একটি নতুন বছর শুরু হয়ে যায়।

কিন্তু এখানে একটি লক্ষণীয় পার্থক্য রয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দিন (day) শব্দটি দুইভাবে ব্যবহার করেন। প্রথমটি হলো সিডেরিয়াল দিন অর্থাৎ দূরবর্তী নক্ষত্রের তুলনায় একটি গ্রহ নিজের অক্ষে একবার ঘুরতে যে সময় নেয়। শুক্রগ্রহের ক্ষেত্রে এই সময়টা ২৪৩ পার্থিব দিবসের সমান।

অন্যদিকে আছে সৌর দিন, অর্থাৎ একটি সূর্যোদয় থেকে পরবর্তী সূর্যোদয় পর্যন্ত সময়। কোনো গ্রহের নিবাসীরা এই দিনটিই অনুভব করে থাকে সাধারণত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, শুক্রগ্রহে এই সৌর দিনের দৈর্ঘ্য মাত্র ১১৭ পার্থিব দিবসের সমান। অর্থাৎ, সেখানে এক সূর্যোদয় থেকে অন্য সূর্যোদয়ের ব্যবধান শুক্র গ্রহের এক বছরের প্রায় অর্ধেক। ফলে একটি বছর শেষ হওয়ার আগেই সূর্য প্রায় দুবার উদিত হতে পারে।

শুক্রগ্রহের এই অদ্ভুত আচরণের পেছনে রয়েছে তার আরও একটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য, সেটা হল তার ঘূর্ণনের অভিমুখ। পৃথিবীসহ সৌরজগতের অধিকাংশ গ্রহ পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘোরে। কিন্তু শুক্রগ্রহ ঘোরে উল্টো দিকে। ফলে সেখানে যদি কোনো পর্যবেক্ষক দাঁড়াতে পারতেন, তবে তিনি দেখতেন সূর্য পশ্চিম আকাশে উদিত হচ্ছে এবং পূর্ব আকাশে অস্ত যাচ্ছে। সৌরজগতের পরিচিত দৃশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত এই ঘটনা শুক্রগ্রহকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

তবে বাস্তবে সেই সূর্যোদয় উপভোগ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ শুক্রগ্রহের ঘন কার্বন ডাই-অক্সাইড, বায়ুমণ্ডলীয় স্তর এবং পুরু সালফিউরিক অ্যাসিডের মেঘ সূর্যালোককে ঢেকে রাখে। ফলে সূর্যোদয় সেখানে পৃথিবীর মতো স্পষ্ট দৃশ্য নয়; বরং ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা এক মলিন আলো। তার ওপর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৪৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বায়ুচাপ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৯০ গুণ বেশি। সে এক চরম বৈরী পরিবেশ।

বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন, কেন শুক্রগ্রহ এত ধীরে এবং উল্টো দিকে ঘোরে। কেউ মনে করেন, গ্রহটির জন্মের পর কোনো বিশাল মহাজাগতিক সংঘর্ষ তার ঘূর্ণনকে বদলে দিয়েছিল। অন্য গবেষকদের মতে, কোটি কোটি বছর ধরে ঘন বায়ুমণ্ডলে সৃষ্ট শক্তিশালী বায়ুমণ্ডলীয় জোয়ার-ভাটা তার ঘূর্ণনকে ধীর করে উল্টো দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবে রহস্যটির চূড়ান্ত সমাধান এখনও অধরাই।

শুক্রগ্রহে এক দিন এক বছরের চেয়েও বড়, এই কথাটি প্রযুক্তিগতভাবে সত্য, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতার দিক থেকে পুরো সত্য নয়। বাস্তবে সেখানে একটি পূর্ণ আবর্তন বছরের চেয়ে দীর্ঘ, কিন্তু সূর্যোদয় থেকে সূর্যোদয়ের ব্যবধান অনেক কম। আর এই অদ্ভুত বৈপরীত্যই শুক্রগ্রহকে সৌরজগতের এক বিস্ময়কর ও রহস্যময় জগতে পরিণত করেছে।

 

সূত্র: Space Daily, 30th May 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 + thirteen =