
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা শৈবালের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এমন এক বিশাল ভাইরাস আবিষ্কার করেছেন, যা আগে কারো নজরে পড়েনি। সাধারণ চেহারার সবুজ শৈবাল ক্লামিডোমোনাস রেইনহারটাই বহু বছর ধরে গবেষণাগারে ব্যবহৃত হত। তারই জিনোমের ভেতর লুকিয়ে ছিল পুনুই ভাইরাস (punuivirus) নামের এই অদ্ভুত ভাইরাস।
ভাইরাসটির আকার ও জিনোম দুটোই বিশাল, অথচ এটি বছরের পর বছর অদৃশ্য থেকে গেছে। এর জিনোমের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬১৭ কিলোবেস, যা অনেক ব্যাকটেরিয়ার থেকেও বড়। তবুও এটি কোষকে হত্যা না করেই শৈবালের ভেতরে দীর্ঘ কাল সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। ঠিক সময়ে জেগে উঠে ভাইরাস কণা তৈরি করে, অথচ কোষগুলোর বেশিরভাগই অক্ষত থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শৈবালের ক্লামিডোমোনাস রেইনহারটাই প্রজাতির ক্রোমোজোম ১৫-এ প্রায় ৬,১৭,০০০ জোড়া বেস বিশিষ্ট ভাইরাসের জিনোম যুক্ত হয়েছে। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণে দেখা গেছে ভাইরাস কণাটি প্রায় ২০০ ন্যানোমিটার চওড়া , যা অল্প কিছু কোষে তৈরি হলেও পুরো কালচার স্বাভাবিক দেখায়।
এই ভাইরাসের বিশেষত্ব হল:
১. এটি প্রমাণ করেছে যে শৈবালেও সুপ্ত অবস্থায় বিশাল ভাইরাস বিদ্যমান।
২. এ ধরনের ভাইরাস পোষকের জিনোমে নিজেদের জিন ছড়িয়ে দেয়, ফলে হঠাৎ করে নতুন বৈশিষ্ট্য ও বিবর্তনীয় পরিবর্তন ঘটতে পারে।
৩. পরিবেশতত্ত্বের দিক থেকেও এটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ শৈবাল খাদ্যজালের মূলভিত্তি এবং তারা গোপনে ভাইরাসের জিন ছড়াতে পারে।
এই ভাইরাসের ৬১৭ কিলোবেসের ডিএনএ বিশ্বের বৃহত্তম ডিএনএ ভাইরাসগুলির একটি।
এর আঠার ন্যায় ইন্টিগ্রেজ উৎসেচক ভাইরাস ডিএনএকে পোষক ক্রোমোজোমে বসাতে সাহায্য করে। এদের ফ্যানজর নিউক্লিয়েজ নামক বিশেষ জিন আছে , যা আরএনএ দ্বারা নির্দেশিত হয়ে ডিএনএ-কে কাটতে পারে। এটি CRISPR পদ্ধতির মতো হলেও আলাদা প্রক্রিয়ায় কাজ করে।এই ভাইরাসের নিজস্ব ডিএনএ পলিমারেজ, ক্যাপসিড প্রোটিন ও ট্রান্সক্রিপশন মেশিনারি আছে। পোষক দেহে জেগে ওঠার পর এটি অনেকাংশে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।
এই ভাইরাসের বৈশিষ্ট্য বায়োটেকনোলজিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। কারণ এটি বড় আকারের ডিএনএ পোষক জিনোমে সঠিকভাবে প্রবেশ করাতে পারে। ফ্যানজর নিউক্লিয়েজ ব্যবহার করে জিন সম্পাদনার নতুন পদ্ধতি তৈরি হতে পারে, যেখানে CRISPR কার্যকর নয়।
বিজ্ঞানীরা চিকিৎসা বা কৃষিতে এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময়ে জিন সক্রিয় করতে পারবেন।
পুনুই ভাইরাস শুধু ভাইরাস বিদ্যা নয়, জিন প্রকৌশল ও বিবর্তন গবেষণায়ও এক মস্ত সংযোজন। এ থেকে জানা গেল, ল্যাবরেটরিতে দীর্ঘ কাল ধরে ব্যবহৃত পরিচিত জীবের মধ্যেও এখনো লুকিয়ে আছে বিস্ময়কর রহস্য, যা ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও জীববিজ্ঞানকে আমূল বদলে দিতে পারে।
সূত্র: Cryptic information of a giant virus in a unicellular green alga by Maria P. Erazo-Garcia, Uri Sheyn, et.al ; Science (10. 4. 2025).