সন্তান প্রসব একটি অত্যন্ত জটিল ও নিয়ন্ত্রিত জৈবিক প্রক্রিয়া। আমাদের দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল, এই প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রধানত হরমোন নির্ভর—বিশেষ করে অক্সিটোসিন ও প্রোজেস্টেরনের মতো হরমোন জরায়ুর সংকোচন ও প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, বাস্তবে প্রসব একটি ছন্দময় সক্রিয় জৈব সিদ্ধান্তপ্রক্রিয়া। যেখানে সময়, শক্তি ও সমন্বয়ই সবকিছু। প্রসব কেবল রাসায়নিক সংকেতের ওপর নির্ভরশীল নয়। অর্থাৎ, জরায়ু কেবল রাসায়নিক বার্তার অপেক্ষায় থাকে না; বরং নিজস্ব যান্ত্রিক বোধ ব্যবহার করে ঠিক করে কখন সংকোচন শুরু বা জোরদার করা হবে। এই গবেষণাটি ধীরগতির বা থেমে যাওয়া প্রসবের পেছনের জৈবিক কারণ বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
সম্প্রতি স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রসব শুধু রাসায়নিক প্রক্রিয়া নয়, এটি একাধারে যান্ত্রিকও। গর্ভকাল যত এগোয়, জরায়ু তত প্রসারিত হয়, চাপ বাড়ে, টান সৃষ্টি হয়। আর এই চাপ-টানকেই শরীর অনুবাদ করে সংকোচনের ভাষায়।
এই অনুবাদের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি বিশেষ সংবেদক প্রোটিন—PIEZO1 ও PIEZO2। PIEZO1 অবস্থান করে জরায়ুর মসৃণ পেশিতে। সংকোচনের সময় চাপ যত বাড়ে, এটি তত সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে PIEZO2 থাকে জরায়ুমুখ ও যোনিপথের সংবেদনশীল স্নায়ুতে। শিশুর অগ্রগতিতে এই অংশ প্রসারিত হলে PIEZO2 স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া পাঠায়, যা জরায়ুকে আরও শক্তভাবে সংকুচিত হতে উৎসাহ দেয়।
এই দুই সংবেদনব্যবস্থা মিলেই প্রসবের ছন্দ ধরে রাখে। একটির কাজ দুর্বল হলে অন্যটি সামাল দেয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে—যখন দুটো ব্যবস্থাই নিষ্ক্রিয় করা হয়, তখন জরায়ু যেন তার ছন্দ হারায়। সংকোচন দুর্বল হয়, চাপ কমে যায়, আর প্রসবে বাধা পড়ে।
আরও গভীর বিশ্লেষণে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, PIEZO সংকেত জরায়ুর পেশিকোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগকারী প্রোটিন কনেক্সিন–৪৩ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রোটিনই পেশিকোষগুলোকে একসঙ্গে সংকুচিত হতে সাহায্য করে। PIEZO সংকেত কমে গেলে এই সংযোগের তাল কেটে যায়, ফলে সংকোচন আর সমবেত থাকে না।
এই গবেষণাটি করা হয়েছে মূলত ইঁদুরের উপর। তবে বর্তমানে, মানুষের জরায়ুর কোষকলা বিশ্লেষণেও PIEZO1 ও PIEZO2–সংবেদক প্রোটিনের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে একই ধরনের যান্ত্রিক সংবেদনব্যবস্থা মানুষের প্রসবক্রিয়াতেও কার্যকর। এতে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় কেন সম্পূর্ণ স্নায়ু অবরোধ অনেক সময় প্রসবকে দীর্ঘ করে তোলে। আবার, কিছু স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া যে প্রসব প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে, এই গবেষণা তাও স্পষ্ট করেছে।
এই গবেষণা ভবিষ্যতে প্রসব ব্যবস্থাপনায় নতুন চিকিৎসা কৌশল উদ্ভাবনের পথ খুলে দিতে পারে। অকালপ্রসব প্রতিরোধ, দুর্বল সংকোচন জোরদার করা কিংবা ব্যথা নিয়ন্ত্রণের আরও নির্দিষ্ট পদ্ধতি উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সর্বোপরি, এটি স্পষ্ট করে যে জরায়ু কেবল হরমোনের নির্দেশ পালনকারী একটি পেশি নয়; বরং এটি এক সংবেদনশীল অঙ্গ, যা চাপ ও প্রসারণের সংকেত বিশ্লেষণ করে প্রসবের সঠিক সময় ও ছন্দ নির্ধারণ করে।
সূত্র: Scientists discover how the uterus knows when to push during childbirth, Materials provided by Scripps Research Institute, published in Science, 2025; 390 (6774) DOI: 10.1126/science.ady3045
