মস্তিষ্ক কীভাবে বাস্তবতা তৈরি করে, আর সেই বাস্তবতা কীভাবে মুহূর্তে কল্পনার রঙে রঙিন হয়ে ওঠে , তার এক চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন জার্মানির রুঢ় ইউনিভার্সিটি বোকামের বিজ্ঞানীরা। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, সাইকেডেলিক যৌগ আমাদের চেতনার ভারসাম্য বদলে দিয়ে বাইরের জগতের প্রভাব কমিয়ে দেয় এবং গচ্ছিত স্মৃতির ভাণ্ডারকে সামনে নিয়ে আসে। সাইকেডেলিক যৌগ বলতে এমন রাসায়নিক পদার্থকে বোঝায় যা মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী বদলে দিয়ে মানুষকে ভিন্ন স্বাদের অনুভূতি, রঙ, শব্দ বা কল্পিত দৃশ্য দেখতে বাধ্য করতে পারে। ফলস্বরূপ তৈরি হয় হ্যালুসিনেশন বা অলীক বিভ্রম। তাঁদের মতে, সাইকেডেলিক পদার্থ বাহ্যিক দৃশ্য-সংক্রান্ত সংকেতকে দুর্বল করে এবং অভ্যন্তরীণ স্মৃতি-সংযোগকে শক্তিশালী করে তোলে। ফলে বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
সাইকেডেলিক বা চেতনা বিকৃতিকারী যৌগ মস্তিষ্কে কাজ করে সেরোটোনিন রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। সেরোটোনিনের অন্তত ১৪ ধরনের রিসেপ্টর রয়েছে, তবে সাইকেডেলিক পদার্থ বিশেষভাবে 2A রিসেপ্টরকে নিশানা করে। এই রিসেপ্টর দৃশ্য-প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের কার্যকলাপ কমিয়ে দেয় এবং শেখার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। গবেষণা পত্রের প্রধান লেখক ক্যালাম হোয়াইট জানান, এই রিসেপ্টর সক্রিয় হলে বাইরের জগৎ থেকে আসা দৃশ্য-তথ্য আমাদের চেতনার কাছে কম প্রবেশযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে মস্তিষ্ক সেই ঘাটতি পূরণ করতে স্মৃতির খণ্ডচিত্র ব্যবহার করে। এভাবেই সৃষ্টি হয় অলীক বিভ্রম।
গবেষকেরা আরও দেখেছেন, সাইকেডেলিক প্রয়োগের পর মস্তিষ্কের দৃশ্য সংক্রান্ত অঞ্চলে ৫ হার্টজের নিম্ন-কম্পাঙ্কের তরঙ্গ দোলন বৃদ্ধি পায়। এই ধীর তরঙ্গ রেট্রোস্প্লেনিয়াল কর্টেক্স নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সাড়া জাগায়। এটিই আমাদের সংরক্ষিত স্মৃতি আহরণের কেন্দ্র। যখন দৃশ্য সংক্রান্ত অঞ্চল ও এই স্মৃতি-কেন্দ্রের মধ্যে যোগাযোগ বেড়ে যায়, তখন মস্তিষ্ক এক ভিন্ন কার্যকরী অবস্থায় প্রবেশ করে। বাস্তব সময়ের ঘটনাবলির সচেতনতা কমে যায় এবং উপলব্ধির অধিকাংশই স্মৃতিনির্ভর হয়ে ওঠে। গবেষণার নেতৃত্বদানকারী ডার্ক জাঙ্কে একে আংশিক স্বপ্নদশার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
এই পরিবর্তন সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে বিজ্ঞানীরা রিয়েল-টাইম অপটিক্যাল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। পরীক্ষায় ব্যবহৃত বিশেষভাবে জিন-পরিবর্তিত ইঁদুর তৈরি করেছিলেন টমাস নফেল। এসব ইঁদুরের নির্দিষ্ট মস্তিষ্ককোষে প্রভমান প্রোটিন তৈরি হয়, ফলে গবেষকেরা দেখতে পেরেছেন যে কর্টেক্সের ২/৩ ও ৫ নম্বর স্তরের পিরামিডাল কোষ সক্রিয় হয়ে উঠে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান করছে।
এই আবিষ্কার সাইকেডেলিক-সহায়ক থেরাপির বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকেও মজবুত করেছে। নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা পরিবেশে এই পদার্থগুলি ইতিবাচক স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে এবং অতিরিক্ত নেতিবাচক চিন্তার ধরণ ভাঙতে সহায়তা করতে পারে। ফলে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো মানসিক ব্যাধির চিকিৎসায় ব্যক্তিনির্ভর নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হচ্ছে।
সূত্র: “Psychedelic 5-HT2A agonist increases spontaneous and evoked 5-Hz oscillations in visual and retrosplenial cortex” by Callum M. White, Thomas Knöpfel and Dirk Jancke,et.al; 12th January 2026, published in Communications Biology.
DOI: 10.1038/s42003-025-09492-9
