সূর্যমুখী বীজের আটার পুষ্টিগুণ 

সূর্যমুখী বীজের আটার পুষ্টিগুণ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

গম মূলত পশ্চিমি দেশের প্রধান খাদ্যশস্য হলেও রুটি বা পাউরুটি আজকে সব দেশেরই সবচেয়ে জনপ্রিয় খাদ্যগুলোর একটি। কিন্তু পুষ্টিগুণ বাড়াতে গিয়ে প্রায়ই স্বাদ ও গঠন নিয়ে আপস করতে হয়। এবার ব্রাজিলের গবেষকেরা এমন এক অপ্রত্যাশিত উপাদানের সন্ধান পেয়েছেন, যা পাউরুটিকে আরও পুষ্টিকর ও পরিবেশবান্ধব করতে পারে। তাঁরা বলছেন সূর্যমুখী বীজের তেল তৈরির পর পড়ে থাকা আংশিক চর্বিমুক্ত সূর্যমুখী বীজের আটাই হতে পারে সেই পুষ্টিকর রুটির সন্ধান। অথচ উপ-পণ্য হিসেবে এটি প্রায় অবহেলিত।

গবেষণার বিবরণটি প্রকাশিত হয়েছে এসিএস ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি পত্রিকাতে। ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ইনস্টিটিউট অব বায়োসায়েন্সেস-এ কর্মরত প্রধান গবেষক লিওনার্দো মেন্দেস ডি সুজা মেসকিটা জানান— সূর্যমুখী বীজের আটায় ৪০% থেকে ৬৬% পর্যন্ত প্রোটিন থাকতে পারে, যা সাধারণ গমের আটার তুলনায় বহুগুণ বেশি। পাশাপাশি এতে রয়েছে খাদ্যতন্তু, লোহা, ক্যালসিয়াম এবং উচ্চমাত্রার ক্লোরোজেনিক অ্যাসিড, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রদাহনাশক ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

গবেষকেরা পাউরুটির পাকপ্রণালীতে ১০% থেকে ৬০% পর্যন্ত গমের আটার বদলে সূর্যমুখী বীজের আটা ব্যবহার করেন। দেখা গেছে, যেখানে সাধারণ গমের রুটিতে প্রোটিন থাকে প্রায় ৮%, সেখানে সূর্যমুখী বীজের আটা বেশি পরিমাণে ব্যবহার করার ফলে প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭%-এরও বেশি। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই রুটি আলফা অ্যামাইলেজ ও প্যানক্রিয়াটিক লাইপেজ উৎসেচকের কার্যকলাপ আংশিকভাবে দমন করতে পারে। এটা রক্তে শর্করা ও চর্বির বিপাক নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।

তবে সবকিছুই যে নিখুঁত তা নয়। ২০% বা তার বেশি সূর্যমুখী বীজের আটা ব্যবহার করলে রুটি কিছুটা শক্ত ও ঘন হয়ে যায়, নরম ভাব কমে এবং ভেতরের বায়ুকোষের গঠন বদলে যায়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে গবেষকেরা ব্যবহার করেন সূর্যমুখী আটার জলীয় নির্যাস। দেখা যায়, এই নির্যাস যোগ করলে রুটির গঠন ও নরমভাব অনেকটাই প্রচলিত গমের রুটির মতো থাকে, অথচ পুষ্টিগুণ অটুট থাকে।

এই উদ্ভাবনের আরেকটি তাৎপর্য পরিবেশগত। সূর্যমুখী তেল নিষ্কাশনে সাধারণত রাসায়নিক দ্রাবক ব্যবহার করা হয় না; যান্ত্রিক চাপেই তেল বের করা হয়। ফলে অবশিষ্ট আটা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং দামেও অত্যন্ত সস্তা। শিল্পের ‘বর্জ্য’কে এইভাবে মূল্যবান খাদ্য উপাদানে রূপান্তর করা চক্রাকার অর্থনীতির বাস্তব উদাহরণ। শিল্পবর্জ্যকে পুনর্ব্যবহার করে পুষ্টিকর খাদ্য তৈরি করা অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত—এই তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে অপচয় কমে, সম্পদের সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার নিশ্চিত হয়। সব মিলিয়ে, সূর্যমুখী বীজের আটা কেবল রুটির পুষ্টিমান বাড়ানোরই উপায় নয়; এটি খাদ্যশিল্পে টেকসই ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিরও ইঙ্গিত। ভবিষ্যতে যদি বাণিজ্যিকভাবে সঠিক অনুপাত নির্ধারণ করা যায়, তবে আমাদের দৈনন্দিন রুটিই হয়ে উঠতে পারে বিজ্ঞানসম্মত উদ্ভাবন ও পরিবেশ-সচেতনতার এক সুস্বাদু প্রতীক।

 

সূত্র: “Repurposing Sunflower Seed Flour for Nutritional and Functional High-Protein Breads within a Circular Economy Framework” by Leonardo Mendes de Souza Mesquita, Etiene Valeria Aguiar,et.aj; 9th April 2025, ACS Food Science & Technology.

DOI: 10.1021/acsfoodscitech.4c01008

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 1 =