সোনায় কেন জং ধরে না?

সোনায় কেন জং ধরে না?

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ জুলাই, ২০২৬

সোনা ধাতু হিসেবে বরাবরই মানবসভ্যতার কাছে সম্পদ, ক্ষমতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক। মিশরের পিরামিড থেকে শুরু করে আজকের দিনের আধুনিক অলংকার, সময়ের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় সোনা তার দীপ্তি অক্ষুণ্ণ রেখেছে। অথচ অধিকাংশ ধাতুই বাতাসের অক্সিজেন ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে এসে জারণের ফলে কালচে হয়ে যায়, কোনো কোনো ধাতু তো আবার ক্ষয়েও যায়। সোনা এই স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রমের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এতদিন মূলত এর রাসায়নিক নিষ্ক্রিয়তার কথাই বলেছেন। তবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই ধারণার বাইরেও অন্য একটি নতুন কারণ খুঁজে পেয়েছেন।

টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, সোনার পৃষ্ঠে থাকা কিছু পরমাণু নিজেদের অবস্থান স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুনর্বিন্যস্ত করে এমন এক বিশেষ কাঠামো গড়ে তোলে, যা অক্সিজেনের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়াকে কার্যত প্রতিহত করে। অর্থাৎ, সোনা শুধু রাসায়নিকভাবে নিষ্ক্রিয় বলেই নয়, বরং তার পৃষ্ঠে গড়ে ওঠা এই পরমাণবিক প্রতিরক্ষাকবচের কারণেও জারণের হাত থেকে রক্ষা পায়।

ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স-এ প্রকাশিত গবেষণায় টুলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ মন্টেমোর এবং পোস্টডক্টরাল গবেষক সান্তু বিশ্বাস উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে দেখেন, অক্সিজেন অণু সোনার দুটি বহুল প্রচলিত কেলাস -পৃষ্ঠের সংস্পর্শে এলে কী ঘটে। গবেষণায় দেখা যায়, যদি সোনার পৃষ্ঠের পরমাণুগুলি নিজেদের পুনর্বিন্যাস না করত, তাহলে অক্সিজেন অণু সহজেই ভেঙে সোনার সঙ্গে বিক্রিয়ায় অংশ নিতে পারত এবং জারণ শুরু হতো।

কিন্তু বাস্তবে পরমাণুগুলির এই পুনর্বিন্যাস অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়ার সম্ভাবনাকে এক বিলিয়ন থেকে এক ট্রিলিয়ন গুণ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। ফলে সোনার পৃষ্ঠে এক অদৃশ্য অত্যন্ত কার্যকর সুরক্ষাস্তর তৈরি হয়, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ধাতুটিকে উজ্জ্বল ও অক্ষত রাখতে সাহায্য করে। গবেষকদের মতে, সোনার জারণ-প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের এটি একটি মৌলিক ব্যাখ্যা, যা আগে সত্যিই জানা ছিল না।

এই আবিষ্কার শুধু সোনার বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, শিল্প-রসায়নের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে সোনা ও প্যালাডিয়ামের সংকর অনুঘটক ব্যবহার করে ভিনাইল অ্যাসিটেট উৎপাদন করা হয়, যা প্লাস্টিক, আঠা ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। এছাড়া যানবাহনের নির্গত কার্বন মনোক্সাইড অপসারণ, প্রোপিলিন অক্সাইড উৎপাদন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রেও সোনাভিত্তিক অনুঘটকের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে।

তবে এখানেই রয়েছে এক ধরনের বৈপরীত্য। যে বৈশিষ্ট্য সোনাকে অলংকার হিসেবে এত দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে, সেটিই অনুঘটক হিসেবে তার কার্যকারিতা সীমিত করে। কারণ কার্যকর অনুঘটকের অন্যতম শর্ত হলো অক্সিজেন অণুকে দ্রুত ভেঙে রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করা। কিন্তু সোনার পৃষ্ঠে গড়ে ওঠা এই পরমাণবিক সুরক্ষাকবচ ঠিক সেই প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করে।

 

গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যদি এই প্রতিরক্ষামূলক পরমাণু-বিন্যাসকে নিয়ন্ত্রণ করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা যায়, তাহলে সোনা অনেক বেশি সক্রিয় ও দক্ষ অনুঘটকে পরিণত হতে পারে। এতদিন এই ধরনের গবেষণা মূলত অন্যান্য ধাতুর সঙ্গে সোনা মিশিয়ে তৈরি সংকর ধাতু বা ন্যানোকণার ব্যবহারেই সীমাবদ্ধ ছিল। নতুন এই গবেষণায় দেখা গেছে,আসলে স্বর্ণ-পৃষ্ঠের জ্যামিতিক বিন্যাস নিয়ন্ত্রণ করাই হতে পারে আরও কার্যকর অনুঘটক তৈরির নতুন কৌশল।

গবেষণাটি সোনার অপরিবর্তিত ঔজ্জ্বল্যের পেছনের বৈজ্ঞানিক রহস্য উন্মোচনের পাশাপাশি উন্নত শিল্প-অনুঘটক, সবুজ রসায়ন এবং ভবিষ্যতের শক্তি প্রযুক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণুর বিন্যাস যে একটি ধাতুর রাসায়নিক আচরণ, স্থায়িত্ব এবং শিল্পগত সম্ভাবনাকে আমূল বদলে দিতে পারে, এই গবেষণা তারই এক গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

 

সূত্র: “Role of Reconstruction in the Inertness of Gold toward Oxygen” by Santu Biswas and Matthew M. Montemore, 21st May 2026, published in Physical Review Letters. DOI: 10.1103/g3bc-t1qv

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 1 =