সৌরঝড় ও ভূমিকম্পের সম্ভাব্য সম্পর্ক

সৌরঝড় ও ভূমিকম্পের সম্ভাব্য সম্পর্ক

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ মার্চ, ২০২৬

জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী সৌরঝড় ও ভূমিকম্পের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে এক চমকপ্রদ তাত্ত্বিক মডেলের প্রস্তাব করেছেন। তাঁদের মতে, সূর্যের তীব্র সৌরশিখা যখন পৃথিবীর আয়নমণ্ডলকে অস্থির করে তোলে, তখন সৃষ্ট হয় বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র। সেটি ভূপৃষ্ঠের গভীরে থাকা দুর্বল ফল্ট বা ফাটলযুক্ত চ্যুতি অঞ্চলে অতিরিক্ত ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। গবেষণাটি কোনোভাবেই এ কথা বলছে না যে সূর্য সরাসরি ভূমিকম্প ঘটায়। বরং তা একটি সম্ভাব্য ভৌত প্রক্রিয়ার রূপরেখা দিচ্ছে, যেখানে মহাকাশের আবহাওয়া ও ভূকম্পীয় ক্রিয়াকলাপের মধ্যে সূক্ষ্ম পারস্পরিক সম্পর্ক থাকতে পারে।
এই মডেল অনুযায়ী, পৃথিবীর ভূত্বকের যেসব অংশে অসংখ্য ক্ষুদ্র ফাটল রয়েছে, সেখানে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা ও চাপে জল থাকতে পারে, কখনও কখনও তা সুপারক্রিটিক্যাল অবস্থায়ও থাকতে পারে। বৈদ্যুতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ফাটল অঞ্চলগুলো অনেকটা তড়িৎ ধারক অঞ্চলগুলোর মতো আচরণ করতে পারে। এগুলো একদিকে ভূপৃষ্ঠের সঙ্গে এবং অন্যদিকে নিম্ন আয়নমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এক বিশাল ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক ব্যবস্থার সৃষ্টি করে, যা ভূগর্ভ ও ঊর্ধ্বমণ্ডলকে সংযুক্ত রাখে। যখন সূর্যের তেজ বেড়ে যায়, আয়নমণ্ডলে ইলেকট্রনের ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে নিম্ন আয়নমণ্ডলে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত স্তর তৈরি হতে পারে। ক্যাপাসিটিভ কাপলিংয়ের (সরাসরি সংযোগ ছাড়াই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মাধ্যমে শক্তি বা চার্জের প্রভাব আদান-প্রদান) মাধ্যমে এই চার্জ ভূগর্ভস্থ ফাটল অঞ্চলের ক্ষুদ্র শূন্যস্থানে প্রবল বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে। গবেষকদের গণনায় দেখা গেছে, বড় সৌরঝড়ের ফলে মোট ইলেকট্রন কন্টেন্ট (টি ই সি) কয়েক দশ ইউনিট বেড়ে গেলে ভূত্বকের অভ্যন্তরে কয়েক মেগাপাস্কাল পর্যন্ত ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক চাপ তৈরি হতে পারে। এই চাপ জোয়ারভাটা বা মহাকর্ষ বলের সমতুল্য। আর এগুলো যে ফল্টের স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে তাই তো আগে থেকেই জানা।
অতীতে বহু শক্তিশালী ভূমিকম্পের আগে আয়নমণ্ডলে অস্বাভাবিক পরিবর্তন,যেমন- ইলেকট্রন ঘনত্বের বৃদ্ধি বা আয়নমণ্ডলের উচ্চতা হ্রাস পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এতদিন এগুলোকে মূলত ভূগর্ভস্থ চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হতো। নতুন তত্ত্বটি বলছে, সম্পর্কটি দ্বিমুখীও হতে পারে। পৃথিবীর অভ্যন্তর আয়নমণ্ডলকে প্রভাবিত করতে পারে, আবার আয়নমণ্ডলের অস্থিরতাও দুর্বল চ্যুতি বা ফাটলকে চূড়ান্ত ভাঙনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
গবেষকেরা উদাহরণ হিসেবে ২০২৪ সালের জাপানের নোটো উপদ্বীপের ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করেছেন, যা তীব্র সৌরঝড়ের কিছুদিন পরেই ঘটেছিল। হয়তো এটি কাকতালীয়, তবু সময়গত মিল এই ধারণাকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
সার্বিকভাবে, এই গবেষণা ভূমিকম্পকে শুধু পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ শক্তির পরিণাম হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণাকে প্রসারিত করেছে। ভবিষ্যতে জিএনএসএস-ভিত্তিক আয়নমণ্ডল পর্যবেক্ষণ ও মহাকাশের বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে এই সম্ভাব্য সংযোগ আরও গভীরভাবে যাচাই করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সূত্র: Possible mechanism of ionospheric anomalies to trigger earthquakes – Electrostatic coupling between the ionosphere and the crust and the resulting electric forces acting within the crust by kira Mizuno, Minghui Kao,et.al; International Journal of Plasma Environmental Science and Technology, 3rd February 2026 DOI: 10.34343/ijpest.2026.20.e01003

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 3 =