স্ট্যাটিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া : আতঙ্কের রাজনীতি 

স্ট্যাটিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া : আতঙ্কের রাজনীতি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের মতো নীরব ঘাতক আজও বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় দুই কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। শুধুমাত্র যুক্তরাজ্যের মোট মৃত্যুর প্রায় এক–চতুর্থাংশের জন্য দায়ী এই কার্ডিওভাসকুলার রোগ। এই চরম বাস্তবতাকে সামাল দেওয়ার জন্য স্ট্যাটিন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম সফল ওষুধ। এটি রক্তে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল কমানোর অন্যতম কার্যকর ও বহুল ব্যবহৃত ওষুধ। অথচ জীবনদায়ী এই ওষুধটি নিয়েই সমাজে সবচেয়ে বেশি ভয়, বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা ছড়িয়ে আছে।

একটা দীর্ঘদিনের উপকারী ওষুধ নিয়ে বিভ্রান্তির কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে স্ট্যাটিনের প্যাকেট সংলগ্ন কাগজে স্মতিভ্রংশ, বিষণ্নতা, ঘুমের ব্যাঘাত, যৌন অক্ষমতার মতো উপসর্গের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তালিকাভুক্ত করা থাকে। সেটা দেখে একরকম বহু মানুষই ভীত হয়েই স্ট্যাটিনকে বর্জন করছেন। তবে দ্য ল্যানসেট–এ প্রকাশিত অক্সফোর্ড পপুলেশন হেলথ–এর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি বিস্তৃত গবেষণা বলছে, এই আশঙ্কাগুলির অধিকাংশেরই পোক্ত কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

এই গবেষণাটি এখন পর্যন্ত স্ট্যাটিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে করা সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ। গবেষকেরা ‘কোলেস্টেরল ট্রিটমেন্ট ট্রায়ালিস্টস’ (সিটিটি) কোলাবোরেশন–এর অধীনে পরিচালিত ২৩টি বড় আকারের র‍্যান্ডমাইজড ডাবল ব্লাইন্ড ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। অর্থাৎ, সেখানে রোগীরা জানতেন না তাদের কোন ওষুধ খাওয়ানো হবে। এই ট্রায়ালে অংশগ্রহণ করেন প্রায় দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ। প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই অংশগ্রহণকারীদের স্বাস্থ্যগত পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় স্ট্যাটিন বনাম প্লাসিবো বা নিষ্ক্রিয় ছদ্ম ওষুধ এবং বেশি মাত্রা বনাম কম মাত্রার স্ট্যাটিন উভয় ক্ষেত্রেই।

ফলাফলে স্পষ্ট। প্যাকেটের কাগজে যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তালিকা দেওয়া থাকে, তার প্রায় সবগুলোর ক্ষেত্রেই স্ট্যাটিন গ্রহণকারী ও প্লাসিবো গ্রহণকারীদের মধ্যে কোনো পরিসংখ্যানগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়নি। উদাহরণস্বরূপ, স্মৃতিশক্তি বা বোধবুদ্ধিগত সমস্যার অভিযোগ বছরে মাত্র ০.২ শতাংশ – যা স্ট্যাটিন গ্রুপ ও প্লাসিবো গ্রুপ উভয় ক্ষেত্রেই একই।

এর অর্থ, মানুষ স্ট্যাটিন খাওয়ার সময় এসব সমস্যা অনুভব করলেও, তার জন্য এই ওষুধটিকেই দায়ী করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাস্তবে স্ট্যাটিন গ্রহণে ডিমেনশিয়া, বিষণ্নতা, ঘুমের ব্যাঘাত, যৌন অক্ষমতা, ওজন বৃদ্ধি, বমিভাব, ক্লান্তি বা মাথাব্যথার কোনো অতিরিক্ত ঝুঁকি নেই। তবে স্ট্যাটিন সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত এমন দাবিও করা হয়নি। সেরকমই একটি ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা গেছে লিভারের কিছু রক্তপরীক্ষায় সামান্য অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে (প্রায় ০.১ শতাংশ বৃদ্ধি)। কিন্তু তা লিভারের কোনো রোগ বা লিভার বৈকল্যের মতো গুরুতর সমস্যায় রূপ নেয়নি।

গবেষকদের মতে, স্ট্যাটিন নিয়ে ভয় ও বিভ্রান্তি বহু মানুষকে এই জীবনদায়ী ওষুধ গ্রহণ থেকে বিরত রাখছে, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। অধ্যাপক ক্রিস্টিনা রেইথ ও অধ্যাপক স্যর ররি কলিন্সের মতে, এখন সময় এসেছে স্ট্যাটিন–সংক্রান্ত তথ্যপত্র ও সতর্কবার্তাগুলিকে নতুন করে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের আলোকে সাজানোর। যাতে রোগী ও চিকিৎসকরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

কারণ ভয় নয়, গুজব নয়, চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত প্রমাণের ভিত্তিতে। এই গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত হল যে, স্ট্যাটিনের উপকারিতা বিপুল, আর অধিকাংশ ভয়াবহ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত নয়। স্ট্যাটিন এখনো হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধের অন্যতম নিরাপদ ও কার্যকর হাতিয়ার।

 

 

সূত্র: Statins do not cause the majority of side effects listed in package leaflets, published in The Lancet, University of Oxford, 6th February 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 + 16 =