স্থান নয়, ছন্দই মস্তিষ্কের চাবিকাঠি 

স্থান নয়, ছন্দই মস্তিষ্কের চাবিকাঠি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৮ জানুয়ারী, ২০২৬

দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মানুষের মস্তিষ্ককে বোঝার প্রধান উপায় ছিল তার গঠন। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মনে করে এসেছেন যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কাজ নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ। এই ধারণার সূচনা হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জার্মান স্নায়ুবিশেষজ্ঞ কোরবিনিয়ান ব্রডমানের গবেষণার মাধ্যমে। তিনি কোষের স্তরবিন্যাসের পার্থক্যের ভিত্তিতে মানবমস্তিষ্ককে ৫২টি আলাদা অঞ্চলে ভাগ করেছিলেন, যা আজও ব্রডমান এরিয়া নামে পরিচিত। সেই মানচিত্রের ওপর ভর করেই আমরা জেনেছি—কোন জায়গা ভাষার জন্য, কোনটি স্মৃতির জন্য, আর কোনটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। আধুনিক চিকিৎসা ও গবেষণায় আজও এই ধারণাই প্রচলিত, বিশেষত এফ এম আর আই -এর ক্ষেত্রে।

কিন্তু সুইডেনের কারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে, এই মানচিত্রই হয়তো সবটুকু নয়। নেচার নিউরোসায়েন্স–এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে (মস্তিষ্কের সামনের অংশের চিন্তন অঞ্চল ) নজিরবিহীন মাত্রায় নিউরনের (স্নায়ুকোষের) কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করেছেন—২৪ হাজারেরও বেশি একক স্নায়ুকোষ, একসঙ্গে।

উন্নত নিউরোপিক্সেল প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁরা দেখেছেন, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের নিউরনগুলো ধীর, নিয়মিত ও স্থিতিশীল ছন্দে কাজ করে চলে। এখানে হঠাৎ বিস্ফোরণ বা এলোমেলো সংকেত খুব কম। এই বৈশিষ্ট্য সময়ের সঙ্গে অপরিবর্তিত থাকে। মস্তিষ্কের এই অংশটি এক ধরনের শান্ত কিন্তু নির্ভরযোগ্য ছন্দ ধরে রাখে। তুলনায় হিপোক্যাম্পাস বা সংবেদ কর্টেক্সে স্নায়ুকোষগুলো অনেক বেশি দ্রুত ও অনিয়মিতভাবে সাড়া দেয়।

আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই ধীর স্থির ছন্দ কেবল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সেই সীমাবদ্ধ নয়। মস্তিষ্কের অন্যান্য উচ্চস্তরের জ্ঞানীয় অঞ্চলেও একই ধরণের ছন্দ দেখা যায়। এতে ইঙ্গিত মেলে যে, উচ্চতর চিন্তা, পরিকল্পনা ও বিমূর্ত ভাবনার সঙ্গে জড়িত থাকে নির্দিষ্ট কোনো স্থান বা অঞ্চল নয়, বরং নির্দিষ্ট কার্যকলাপের ধরণ ।

তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রভৃতি কাজে সব স্নায়ুকোষ একরকম প্রতিক্রিয়া দেখায় না। কিছু স্নায়ুকোষ দ্রুত ও অনিয়মিতভাবে সক্রিয় হয়, তারা মুহূর্তের তথ্য দ্রুত ধরে ফেলে। গবেষকদের মতে, ধীর ও স্থিতিশীল স্নায়ুকোষগুলো একটি নিরাপদ পটভূমি তৈরি করে, যার ওপর দ্রুতগতির স্নায়ুকোষগুলো নির্দিষ্ট তথ্য বসিয়ে দেয়। এই সমন্বয়ই মস্তিষ্ককে একই সঙ্গে স্থিতিশীল ও নমনীয় করে তোলে।

সব মিলিয়ে গবেষণাটি এক স্পষ্ট ধারণা সামনে আনে, যে মস্তিষ্কের কাজ নির্দিষ্ট সীমানায় বন্দী নয়। এ কাজের জন্ম হয় স্নায়ুকোষের ছন্দ, সংযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা থেকে। আজ আমাদের সামনে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে মস্তিষ্কের এক নতুন মানচিত্র, যেখানে কঠোর সীমানার বদলে ছন্দ, সম্পর্ক ও সংযোগই মূল ভাষা।

 

সূত্র: Nautilus Magazine, https://www.facebook.com/share/17cszbKAc8/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen + 9 =