স্লিপ অ্যাপনিয়ার সহজ চিকিৎসা 

স্লিপ অ্যাপনিয়ার সহজ চিকিৎসা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ জুন, ২০২৬

অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (ও এস এ) একটি গুরুতর ঘুমজনিত সমস্যা। সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এই রোগে ভুগছেন। এই রোগের মূল উপসর্গ হল ঘুমের সময় উপরের শ্বাসনালী বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস থেমে থেমে চলে, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এই রোগ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস এবং অতিরিক্ত ক্লান্তির ঝুঁকি বাড়ায়।

২০২৬ সালের ATS (American Thoracic Society) আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত একটি বৃহৎ তৃতীয় পর্বের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, AD109 নামের একটি প্রতিরাতে খাওয়ার ট্যাবলেট রোগটির লক্ষণ কমাতে সক্ষম। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বর্তমানে ও এস এ চিকিৎসার প্রধান পদ্ধতি হলো CPAP (কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ার ওয়ে প্রেসার) মেশিন, যা অনেক রোগীর কাছে অস্বস্তিকর এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করা কঠিন।

AD109 হলো অ্যারক্সিবিউটিনিন এবং অ্যাটোমোক্সেটিন নামক দুটি ওষুধের সমন্বয়। এই ওষুধগুলো ঘুমের সময় গলার পেশিগুলোকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে, ফলে শ্বাসনালী ধসে পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়। অর্থাৎ, এটি কেবল উপসর্গ দমন করে না; বরং রোগের পেছনের স্নায়ু-পেশি সম্পর্কিত সমস্যার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

SynAIRgy নামে পরিচিত এই ছয় মাসব্যাপী গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ৬৯টি কেন্দ্রের ৬৪৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণ করেন। তাদের সবারই হালকা থেকে গুরুতর মাত্রার স্লিপ অ্যাপনিয়া ছিল এবং তারা হয় CPAP ব্যবহার করতে পারছিলেন না, বা বলা ভালো ব্যবহার করতে অনিচ্ছুক ছিলেন।

দেখা যায়, AD109 গ্রহণকারীদের অ্যাপনিয়া-হাইপোক্সিয়া ইনডেক্স /AHI (প্রতি ঘণ্টায় কতবার শ্বাসপ্রশ্বাসে বিঘ্ন ঘটে তার সংখ্যা) গড়ে ৪৪ শতাংশ কমে যায়। তুলনামূলকভাবে প্লাসিবো গ্রুপে এই হ্রাস ছিল মাত্র ১৮ শতাংশ। এছাড়া AD109 রক্তে অক্সিজেনের পতনের হার এবং সামগ্রিক অক্সিজেন ঘাটতির মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।

সবচেয়ে নজরকাড়া তথ্য হলো, ওষুধটি গ্রহণকারীদের ৪০ শতাংশেরও বেশি রোগী রোগের একটি নিম্নতর তীব্রতার পর্যায়ে পৌঁছেছেন, আর প্রায় ১৮ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে স্লিপ অ্যাপনিয়া কার্যত সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। রোগীর ওজন, শারীরিক গঠন কিংবা রোগের তীব্রতা কোনোটিই ওষুধটির কার্যকারিতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেনি। গবেষকদের মতে, রোগীর ওজন বা রোগের তীব্রতা যাই হোক না কেন, ওষুধটির সুফল প্রায় একই রকম ছিল।

নিরাপত্তার দিক থেকেও AD109 আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে ছিল মুখ শুকিয়ে যাওয়া, বমিভাব, অনিদ্রা এবং প্রস্রাব করতে অসুবিধা। যদিও প্রায় ২১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে চিকিৎসা বন্ধ করেন, তবুও গবেষকরা সামগ্রিক নিরাপত্তা চিত্রটিকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের FDA ইতিমধ্যেই AD109-কে Fast Track/লক্ষ্য অর্জনের মর্যাদা দিয়েছে। ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাপনিমেড ইতিমধ্যে FDA-র কাছে অনুমোদন লাভের আবেদন জমা দিয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের প্রথম দিকেই এই ওষুধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

যদি AD109 অনুমোদন পায়, তবে এটি হবে স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসায় প্রথম কার্যকর খাওয়ার ওষুধ। আর পাশাপাশি তা এমন লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য সহজ বিকল্প হবে, যারা আজও CPAP-এর সীমাবদ্ধতার কারণে কার্যকর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত।

 

সুত্র: “Aroxybutynin and atomoxetine (AD109) for obstructive sleep apnea: a randomized phase 3 trial (SynAIRgy)” by Patrick J Strollo, Ron Farkas, et.al;18th May 2026, published in American Journal of Respiratory and Critical Care Medicine. DOI: 10.1093/ajrccm/aamag215

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 2 =