কৈশোরে একটি বই পড়ে ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা CERN-এর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন মার্ক টমসন। সেই বই তাঁকে মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে গভীর কৌতূহলী করে তুলেছিল। আবার অনেক প্রশ্নের উত্তর না পাওয়ায় তিনি হতাশও হন। চার দশকেরও বেশি সময় পরে তিনি আজ CERN-এর পরিচালক। আর তাঁর নেতৃত্বেই বিশ্বের বৃহত্তম কণাত্বরক লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (LHC) সাময়িকভাবে বন্ধ হচ্ছে, ভবিষ্যতের আরও উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের পরিকল্পনার লক্ষ্যে। টমসনের মতে, কণা পদার্থবিদ্যা গত কয়েক দশকে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করলেও, এখনও বহু মৌলিক প্রশ্নের উত্তরই অজানা। বিজ্ঞানের অন্যতম সফল তত্ত্ব ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ মহাবিশ্বের দৃশ্যমান পদার্থ ও মৌলিক বলগুলিকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করে। ২০১২ সালে হিগস বোসনের আবিষ্কার সেই তত্ত্বকে প্রায় পূর্ণতা দেয়। কিন্তু এই মডেল ডার্ক ম্যাটার বা অজ্ঞাত পদার্থের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। মহাবিশ্বে বিগ ব্যাংয়ের পরে কেন পদার্থ রয়ে গেল, অথচ প্রতিপদার্থের সঙ্গে মিলিত হয়ে সবকিছু শক্তিতে পরিণত হল না, সেই প্রশ্নেরও কোনো উত্তর নেই। টমসন ভাবেন, যখন তিনি প্রথম সার্ন সম্পর্কে পড়েছিলেন, তখন দুর্বল নিউক্লীয় বলের বাহক কণা W ও Z বোসন আবিষ্কৃত হয়নি। পরে ১৯৮৩ সালে সার্ন-এই সেগুলির সন্ধান পাওয়া যায়। একইভাবে, একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন নিউট্রিনোর কোনও ভর নেই। অথচ গত ২৫ বছরে জানা গেছে, এই কণাগুলিরও ভর রয়েছে। টমসন মনে করেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার নিঃসন্দেহে হিগস বোসন। এটি অন্য সব পরিচিত কণার থেকে আলাদা। এর কোনো বৈদ্যুতিক আধান নেই, ঘূর্ণনও নেই। হিগস ক্ষেত্র গোটা মহাবিশ্বে বিস্তৃত এবং সেই ক্ষেত্রই অন্যান্য কণাকে ভর প্রদান করে। হিগস ক্ষেত্র না থাকলে ইলেকট্রন থেকে শুরু করে সব কণাই ভরহীন হতো, আর পরমাণুর অস্তিত্বও বর্তমানের রূপে থাকত না। যদিও হিগস বোসনকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত। এটি কি সত্যিই একটি মৌল কণা, নাকি এর আরও সঙ্গী রয়েছে? অজ্ঞাত ম্যাটারের সঙ্গে কি এর কোনও সম্পর্ক আছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই সার্নের আগামী দিনের পরিকল্পনা। আগামী ২৯ জুন থেকে LHC চার বছরের জন্য বন্ধ থাকবে। এই সময়ে ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ রিংয়ের প্রায় ১.২ কিলোমিটার অংশে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা হবে। নতুন শক্তিশালী সুপারকন্ডাক্টিং চুম্বক ব্যবহার করে প্রোটন কণাগুলিকে আরও ঘনভাবে সংঘর্ষ ঘটানো হবে। এর ফলে আগের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যায় বিরল কণা উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এই ‘হাই-লুমিনোসিটি LHC’ বিপুল সংখ্যক হিগস বোসন তৈরি করবে, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো হিগস বোসনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে নিজের সঙ্গে তার পারস্পরিক ক্রিয়া, নির্ভুলভাবে পরিমাপ করতে পারবেন। সংস্থাটি ‘ফিউচার সার্কুলার কোলাইডার’ (FCC) নামে নতুন প্রজন্মের একটি কণাত্বরক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রায় ১৩ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের এই প্রকল্পকে ইউরোপের কণা পদার্থবিদদের বড় অংশই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। টমসনের কথায়, তাঁর কণা পদার্থবিদ্যার দশটি বড় প্রশ্নের অন্তত অর্ধেকই হিগস বোসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। FCC-কে প্রথমে একটি ইলেকট্রন-পজিট্রন কোলাইডার হিসেবে ব্যবহার করা হবে, যেখানে অত্যন্ত পরিষ্কার পরিবেশে বিপুল সংখ্যক হিগস বোসন তৈরি করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সীমাবদ্ধতা খুঁজে বের করার আশা করছেন। অনেকের প্রশ্ন, এত বিপুল অর্থ ব্যয় করা কি যুক্তিযুক্ত? টমসনের জবাব, বড় বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির জন্য বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। সার্ন-এ তৈরি প্রযুক্তি শুধু মৌলিক বিজ্ঞানেই নয়, ক্যানসার চিকিৎসা, উন্নত ত্বরক প্রযুক্তি এবং অন্যান্য গবেষণাক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আজকের দুনিয়া বদলে দেওয়া ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবও জন্ম নিয়েছিল CERN-এর একটি ছোট অফিসে, মূলত বিজ্ঞানীদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের উদ্দেশ্যে। তাঁর বিশ্বাস, আগামী এক দশকের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কোথাও না কোথাও একটি বড় ফাটল ধরা পড়বেই। আর সেই ফাটলই হয়তো মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যগুলির উত্তর খুঁজে পাওয়ার পথ খুলে দেবে।
সূত্র: NewScientist ; June ; 2026
