বিশ্ব ইতিমধ্যেই রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রার সঙ্গে লড়ছে। তারমধ্যেই বিজ্ঞানীরা আরও বড় এক জলবায়ু বিপদের আভাস দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে গড়ে ওঠা বর্তমান এল নিনো এতটাই শক্তিশালী হতে পারে যে এটি গত অন্তত ১৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এল নিনো হিসেবে রেকর্ড গড়তে পারে। আর যদি সেই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তবে মানবসৃষ্ট বিশ্ব উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হতে চলেছে।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও বায়ুপ্রবাহের একটি স্বাভাবিক কিন্তু শক্তিশালী পরিবর্তন, যা বিশ্বের আবহাওয়ার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর এই জলবায়ু চক্র ফিরে আসে। তবে এবারের ঘটনাকে ঘিরে উদ্বেগের কারণ হলো এর অস্বাভাবিক দ্রুত শক্তি সঞ্চয় এবং সম্ভাব্য তীব্রতা।
ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান বার্কলে আর্থ-এর জলবায়ুবিজ্ঞানী জেক হাউসফাদার জানান, একাধিক উন্নত জলবায়ু মডেলের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এবারের এল নিনোর সর্বোচ্চ তীব্রতা ২০১৫–১৬ সালের রেকর্ডধারী এল নিনোকেও উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এমন ফলাফল সত্যিই তাঁদের কল্পনারও বাইরে।
তাঁদের ধারণা, এই এল নিনো যদি আশঙ্কা অনুরূপ পথে বিকশিত হয়, তাহলে ২০২৭ সালে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় প্রায় ১.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। যদিও এটি স্থায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের নির্দেশক নয়, তবুও এটি প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমার বিপজ্জনক নৈকট্যের একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) জানিয়েছে, বছরের শেষ নাগাদ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি অন্তত ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কিছু গবেষকের মতে আবার, বাস্তব পরিস্থিতি NOAA-এর পূর্বাভাসের চেয়েও তীব্র হতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা, খরা, আকস্মিক বন্যা, দাবানল এবং শক্তিশালী ঝড়ের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। কৃষি উৎপাদন,জলের প্রাপ্যতা এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাও কম নয়। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৭–৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি প্রায় ৫.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতির মুখে পড়েছিল। বর্তমান এল নিনো যদি আরও শক্তিশালী হয়, তবে ২০৩২ সালের মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এছাড়া অতিরিক্ত উষ্ণ সমুদ্রের কারণে প্রবাল প্রাচীরের ব্যাপক শ্বেতায়ন, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং বন ও মহাসাগরের কার্বন শোষণক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বায়ুমণ্ডলে আরও বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড থেকে যাবে, যা বিশ্ব উষ্ণায়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এবারের এল নিনো কেবল একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া ঘটনা নয়; এটি এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্রকেও আরও চরম করে তুলছে। তাই ২০২৭ সালের সম্ভাব্য তাপমাত্রার রেকর্ড শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়,এটি জলবায়ু সংকটের গভীরতর বাস্তবতার প্রতিফলন।
সূত্র: doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-02293-y
