হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া 

হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

সম্প্রতি নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণা পত্রে বিজ্ঞানীরা এক উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন। এটি রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে এবং ধমনিতে জমে থাকা চর্বির আস্তরণ সংকুচিত করতে সক্ষম। অর্থাৎ, মানবদেহের অন্ত্রে বসবাসকারী অণুজীব শুধু হজমে সাহায্য করে না, হৃদ্‌যন্ত্রের সুস্থতাও বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার উপকারিতা যাচাই করার জন্য ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করা হয়। দেখা গেছে, এই ব্যাকটেরিয়া থেকে উৎপন্ন একটি অণু ধমনির ক্ষতিকর আস্তরণ প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে।

হৃদ্‌রোগের অন্যতম প্রধান কারণ অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস। এক্ষেত্রে ধমনির দেওয়ালে চর্বি, কোলেস্টেরল ও প্রদাহজনিত উপাদান জমে প্লাক বা আস্তরণ তৈরি হয়। ফলে রক্ত চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যায় এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। কোলেস্টেরল কমাতে স্ট্যাটিন জাতীয় ওষুধ বহুল ব্যবহৃত হলেও খুব জটিল পর্যায়ের হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক মানুষের ক্ষেত্রে শুধু এই ওষুধে যথেষ্ট কার্যকর হয় না। আবার কেউ কেউ বেশি মাত্রার ওষুধ সহ্য করতে পারেন না। এই সমস্যার বিকল্প খুঁজতে চিনের শেনঝেনের সান ইয়াত-সেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েনজিং ঝাও এবং তাঁর সহকর্মীরা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ও সুস্থ ব্যক্তিদের মলের নমুনায় উপস্থিত অন্ত্রের অণুজীব বিশ্লেষণ করেন। তাতে ব্যাক্টেরয়েডস ইউনিফরমিস নামের একটি ব্যাকটেরিয়া বিশেষভাবে নজরে আসে। সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় হৃদ্‌রোগীদের অন্ত্রে এই ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ সাধারণভাবে কম ছিল। এরপর গবেষকেরা জিন-পরিবর্তিত ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালান। ইঁদুরগুলিকে উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার দেওয়ার পাশাপাশি জীবিত বি.ইউনিফর্মিস ব্যাকটেরিয়া খাওয়ানো হয়। দেখা যায়, চিকিৎসা না পাওয়া ইঁদুরের তুলনায় তাদের প্রধান ধমনিতে প্লাকের পরিমাণ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। রক্তে মোট কোলেস্টেরল ও ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রাও হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি ধমনির দেওয়ালে প্রদাহ সৃষ্টিকারী প্রতিরোধী কোষের অনুপ্রবেশ কমেছে।

গবেষকেরা এই উপকারের জন্য দায়ী অণু হিসেবে পেন্টাডেকানোয়িক অ্যাসিডকে শনাক্ত করেছেন। এটি একটি ফ্যাটি অ্যাসিড, যেটি যকৃতে কোলেস্টেরল প্রস্তুতকারী একটি উৎসেচকের ক্রিয়াকে বাধা দেয়। স্ট্যাটিন ওষুধটিও ওই একই উৎসেচককে নিশানা করে কাজ করে। এর ফলে যকৃতে এলডিএল রিসেপ্টরের সংখ্যা বাড়ে, যা রক্ত থেকে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সরিয়ে নিতে সাহায্য করে।

মানুষের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করতে গবেষকেরা ২০০-রও বেশি ব্যক্তির রক্ত ও মলের নমুনা পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, যাঁদের রক্তে কোলেস্টেরল-সহ বিভিন্ন চর্বিজাতীয় পদার্থের মাত্রা অস্বাভাবিক বেশি, তাঁদের শরীরে পেন্টাডেকানোয়িক অ্যাসিডের পরিমাণ তুলনামূলক কম। হৃদ্‌রোগীদের অন্ত্রেও এই অণু প্রস্তুতকারী ব্যাকটেরিয়ার জিন কম পাওয়া গেছে।

তবে গবেষণাটির ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও এখনই একে হৃদ্‌রোগের প্রমাণিত চিকিৎসা বলা যায় না। অধিকাংশ পরীক্ষাই ইঁদুরের ওপর হয়েছে এবং ব্যবহৃত ব্যাকটেরিয়ার মাত্রাও মানুষের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া সম্ভাব্য মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। তাই এবার মানুষের ওপর বৃহত্তর ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন। পেন্টাডেকানোয়িক অ্যাসিডকে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের পরিপূরক হিসেবেও বাজারজাত করা হচ্ছে, কিন্তু এর উপকারিতার পক্ষে পর্যাপ্ত চিকিৎসাগত প্রমাণ এখনও নেই।

এই গবেষণা দেখাচ্ছে, অন্ত্রের অণুজীব ও হৃদ্‌স্বাস্থ্যের সম্পর্ক শুধু পারস্পরিক যোগসূত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে নির্দিষ্ট জৈবিক প্রক্রিয়াও থাকতে পারে। ভবিষ্যতে এই ব্যাকটেরিয়া বা তার উৎপাদিত অণুকে কাজে লাগিয়ে হৃদ্‌রোগ প্রতিরোধের নতুন পথ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব চিকিৎসায় রূপ দিতে আরও গবেষণা অপরিহার্য।

 

সূত্র: Revealed: how this common gut microbe protects against heart disease

Intestinal bacterium secretes a molecule that reduces cholesterol production, according to a mouse study By Max Kozlov, Nature 658, 591 (2026), doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-03189-7.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 − 1 =