হোমো ইরেক্টাস ও ডেনিসোভানদের মিলনকহিনী 

হোমো ইরেক্টাস ও ডেনিসোভানদের মিলনকহিনী 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ মে, ২০২৬

প্রায় চার লাখ বছর আগে পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাস করত মানবজাতির এক প্রাচীন আত্মীয় হোমো ইরেক্টাস। আধুনিক মানুষের বিবর্তনের ইতিহাসে এই প্রজাতির গুরুত্ব অপরিসীম। আফ্রিকা ছেড়ে ইউরেশিয়ায় পা রাখা প্রথম মানবগোষ্ঠীগুলোর একটি ছিল তারা। এবার বিজ্ঞানীরা তাদের দাঁতের এনামেল থেকে প্রাচীন প্রোটিন বিশ্লেষণ করে এমন এক চাঞ্চল্যকর তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন, যা মানব ইতিহাসের বহু পুরোনো সম্পর্কের কাহিনীকে নতুন করে সাজাবে। গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে হোমো ইরেক্টাস এবং ডেনিসোভানদের মধ্যে একসময় আন্তঃপ্রজনন বা মিলন ঘটেছিল।

এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান পত্রিকা নেচারে। গবেষণার নেতৃত্ব দেন বেইজিংয়ের Institute of Vertebrate Paleontology and Paleoanthropology-এর জীবাশ্মবিদ কিয়াওমেই ফু। তাঁর দল চীনের তিনটি প্রত্নস্থল থেকে সংগৃহীত ছয়টি হোমো ইরেক্টাসের দাঁত বিশ্লেষণ করেন। এর মধ্যে ছিল বিখ্যাত “পিকিং ম্যান”-এর আবিষ্কারের স্থান ঝৌকৌদিয়ান, যা ১৯২০-এর দশক থেকেই মানব বিবর্তন গবেষণায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাচীন ডিএনএ সাধারণত এত পুরোনো জীবাশ্মে টিকে থাকে না। তাই বিজ্ঞানীরা এবার ভরসা করেছেন দাঁতের এনামেলে সংরক্ষিত প্রোটিনের ওপর। এই প্রোটিনগুলোর অ্যামিনো অ্যাসিডের বিন্যাস বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বিবর্তনীয় সম্পর্কের সূত্র খুঁজে পান। ছয়টি দাঁতের মধ্যে তারা অ্যামেলোব্লাস্টিন নামের একটি এনামেল-প্রোটিনে দুটি বিশেষ প্রকার/ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত করেন।

এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক মানুষ, নিয়ান্ডারথাল এবং অন্যান্য মানব আত্মীয়দের মধ্যে অ্যালানিন নামের অ্যামিনো অ্যাসিড দেখা যায়; কিন্তু এই পূর্ব এশীয় হোমো ইরেক্টাসদের মধ্যে ছিল গ্লাইসিন। গবেষকদের ধারণা, এটি সম্ভবত পূর্ব এশিয়ার হোমো ইরেক্টাসদের একটি স্বতন্ত্র জেনেটিক বৈশিষ্ট্য।

আরও বিস্ময়কর ছিল দ্বিতীয় প্রকারটি। এখানে মেথিওনিনের পরিবর্তে পাওয়া যায় ভ্যালিন নামের অ্যামিনো অ্যাসিড—যা আগে দুইটি ডেনিসোভান জীবাশ্মেও শনাক্ত করা হয়েছিল। এর অর্থ হতে পারে, কোনো এক সময়ে পূর্ব এশিয়ার হোমো ইরেক্টাস এবং ডেনিসোভানদের মধ্যে আন্তঃপ্রজনন ঘটেছিল এবং সেই জিনগত বৈশিষ্ট্য ডেনিসোভানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানীরা আরও পুরোনো ডেনিসোভান নমুনায় এই দুই ধরনের প্রকারই খুঁজে পেয়েছেন, যা ইঙ্গিত দেয় তারা উভয় পূর্বপুরুষের কাছ থেকেই জিন উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। গবেষকদের মতে, এটি মানব বিবর্তনের “ভূতুড়ে স্পিসিস” বা হারিয়ে যাওয়া অজানা মানবগোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রেও হয়ে উঠবে নতুন দিশা। মানব বিবর্তনের ইতিহাস কোনো সরলরৈখিক কাহিনী নয়। বরং এ ছিল বহু মানবপ্রজাতির জটিল সহাবস্থান, সংঘাত ও মিলনের এক বিশাল জৈবিক জাল, যার অজানা অধ্যায় এখনো ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়ে চলেছে ।

 

সূত্র: Nature.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen − 9 =