২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ও কৃবু প্রযুক্তি 

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ও কৃবু প্রযুক্তি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ জুন, ২০২৬

লোকমুখে শোনা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের মেক্সিকো সিটির স্টেডিয়ামে শুরু হওয়া ফিফা বিশ্বকাপ নাকি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বকাপ। ফুটবল সবসময়ই আবেগ, দক্ষতা এবং কৌশলের খেলা হলেও এবার তার সঙ্গে জুড়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা , স্মার্ট সেন্সর, ব্যক্তির ডিজিটাল রূপ এবং উন্নত ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবস্থা। ফলে মাঠের ভেতরে ও বাইরে খেলার প্রতিটি মুহূর্ত আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হবে।

ফুটবলবিষয়ক গবেষণা পত্রিকা সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিন ইন ফুটবল-এর সম্পাদক এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি সিডনির ক্রীড়াবিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কো ইমপেলিজেরি এ নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর মতে, এই বিশ্বকাপে প্রতিটি দল এমন একটি কৃ বু-ভিত্তিক বিশ্লেষণী প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবে, যা খেলোয়াড়দের মাঠে চলাফেরা, অবস্থান পরিবর্তন, গতি এবং কৌশলগত আচরণের তাৎক্ষনিক বিশ্লেষণ করবে। এর ফলে কোচ ও সহকারী কর্মীরা ম্যাচ চলাকালীনই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

বিশ্বকাপে আরেকটি বড় প্রযুক্তিগত সংযোজন হলো কৃবু-নির্মিত ত্রিমাত্রিক ডিজিটাল অবয়ব। খেলোয়াড়দের শরীর স্ক্যান করে তৈরি করা এই ভার্চুয়াল প্রতিরূপগুলো ম্যাচের জটিল পরিস্থিতি পুনর্গঠন করতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে রেফারিদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে অফসাইড, ফাউল বা অবৈধ শারীরিক সংস্পর্শের মতো ঘটনাগুলো আরও নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।

এছাড়া ব্যবহৃত হবে স্মার্ট বল, যার ভেতরে থাকবে বিশেষ সেন্সর। এই সেন্সর বলের গতিবিধি, স্পর্শ এবং আঘাতের তথ্য সংগ্রহ করবে। ফলে বল খেলোয়াড়ের হাতে লেগেছে কি না, কিংবা অফসাইড পরিস্থিতিতে ঠিক কখন বলটি ছোড়া হয়েছে—এসব বিষয় দ্রুত ও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যাবে।

তবে প্রযুক্তি শুধু রেফারিংয়েই সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক ফুটবলে বিজ্ঞান এখন দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বের অধিকাংশ শীর্ষ ক্লাব ও জাতীয় দলে ক্রীড়াবিজ্ঞানী, ডেটা বিশ্লেষক এবং গবেষকরা কাজ করছেন। অনেক ক্লাবের নিজস্ব ডেটা-সায়েন্স বিভাগও রয়েছে। এমনকি পিএইচ ডি গবেষকদেরও সরাসরি দলের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, যাতে তারা বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে থেকে গবেষণা পরিচালনা করতে পারেন এবং সেই গবেষণার ফল মাঠে প্রয়োগ করা যায়।

বর্তমানে ফুটবল গবেষণার সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কৃবুর ব্যবহার, খেলোয়াড়দের শরীরে পরিধানযোগ্য সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ, এবং উন্নত ক্রীড়া বিশ্লেষণী তথ্য। এসব প্রযুক্তি কোচদের খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থা, ক্লান্তি, আঘাতের ঝুঁকি এবং পারফরম্যান্স সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা দেয়। তবে ফ্রাঙ্কো ইমপেলিতজেরি একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তাঁর মতে, কৃবু ও উপাত্ত বিশ্লেষণের সুবাদে গবেষণার পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু তথ্যের পরিমাণ বাড়লেই গবেষণার মান একই হারে বাড়ে না। বিপুল ডেটা থেকে অর্থবহ ও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত বের করতে এখনো বিজ্ঞানীদের অনেক কাজ বাকি।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের প্রতিযোগিতা নয়; এটি ফুটবল ও বিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনের প্রদর্শনীও বটে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর প্রযুক্তি এবং ডেটা-বিশ্লেষণ মাঠের খেলাকে নতুন মাত্রা দেবে এবং ভবিষ্যতের ফুটবল কেমন হবে তার একটি স্পষ্ট ঝলক দেখাবে।

 

সূত্র: doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-01866-1

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 5 =