বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান সাহিত্য ও রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীঃ শতবর্ষ পরে ফিরে দেখা

আগস্ট ২০১৯
-গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
অধ্যাপক, পদার্থবিদ্যা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠ্য বইয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের জন্য বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার ইতিহাস আধুনিক বাংলাভাষার প্রায় সমসাময়িক। বিদ্যাসাগরকে আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক বলে চিহ্নিত করা হয়। তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে কৌতূহলী ছিলেন, সংস্কৃত কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য তাঁর প্রয়াসের ইতিহাস অনেকেরই জানা। তাঁর সমবয়সী ও ঘনিষ্ঠ অক্ষয়কুমার দত্ত সাধারণের জন্য বাংলাতে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার পথিকৃৎ। তাঁর সেই সব রচনা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মাইলফলক। এর পরে যাঁদের নাম করতে হয়, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র, ভূদেব মুখোপাধ্যায় ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এঁদের সকলের সম্মিলিত চেষ্টাতেই বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান সাহিত্য তার প্রাথমিক রূপ লাভ করে।
তবে এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন যে বাংলা ভাষার প্রথম যুগে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার অধিকাংশই ছিল বিদেশী লেখার অনুবাদ ও সংকলন। অক্ষয়কুমার বা বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথাগত বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। অক্ষয়কুমার নিজের উদ্যোগে বিজ্ঞান শিখেছিলেন, মেডিক্যাল কলেজে ক্লাস করেছিলেন। রাজেন্দ্রলালও সেই কলেজের ছাত্র ছিলেন কিছুদিন। সে যুগে কলকাতায় একমাত্র মেডিক্যাল কলেজেই বিজ্ঞান শিক্ষার পাঠক্রম চালু ছিল। হাতে কলমে বিজ্ঞান চর্চার অভ্যাস অক্ষয়কুমারের ছিল। আধুনিক যুগের প্রথম বাঙালী বিজ্ঞানী রাধানাথও বিজ্ঞান শিখেছিলেন পাঠক্রমের বাইরে নিজের উৎসাহে। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে প্রেসিডেন্সি কলেজে বিজ্ঞান পড়েছেন। পরে দীর্ঘদিন রিপন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন। হয়তো সেই অভিজ্ঞতার সুবাদেই বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান সাহিত্য তাঁর হাত ধরে সাবালকত্ব লাভ করে। রামেন্দ্রসুন্দরের লেখা কখনো যদি না পড়েও থাকি, তাহলেও আমরা যারা বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান বিষয়ে পড়ি বা লিখি, সবাই রামেন্দ্রসুন্দরের কাছে ঋণী।
রামেন্দ্রসুন্দরের জন্মস্থান হল মুর্শিদাবাদের কান্দির কাছে জেমো। তাঁর পিতৃপুরুষ ছিলেন কনৌজের বাসিন্দা। যুদ্ধবিশারদ ব্রাহ্মণ হিসাবে তাঁরা আকবরের সেনাপতি মানসিংহের সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছিলেন। রামেন্দ্রসুন্দরের জন্ম ১৮৬৪ সালের ২০ আগস্ট। পড়াশোনায় চিরকালই ভালো ছিলেন, জীবনে মাত্র দুবার কোনো পরীক্ষায় প্রথম হতে পারেননি তিনি। বিএ পরীক্ষাতে তাঁর রসায়নের খাতা সম্বন্ধে বিখ্যাত অধ্যাপক পেডলার বলেছিলেন তাঁর জীবনের দেখা শ্রেষ্ঠ খাতা। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন একসঙ্গে নিয়ে ১৮৮৭ সালে এমএ পাস করার পরে পেডলারের উৎসাহেই প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তির জন্য পরীক্ষা দেন এবং সফল হয়ে আট হাজার টাকা বৃত্তি পেয়েছিলেন।
নানা জায়গা থেকে তাঁর কাছে চাকরির প্রস্তাব এসেছিল। একই সঙ্গে বাঙ্গালোরের কলেজের অধ্যক্ষ ও সেখানকার মানমন্দিরের তত্ত্বাবধায়কের পদ গ্রহণের জন্য পেডলার তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু তিনি বাঙালী সংস্কৃতির পীঠস্থান কলকাতা ছাড়তে তিনি রাজি ছিলেন না। জীবনে তিনি তিনবার বাংলার বাইরে পা দিয়েছিলেন। ১৮৯২ সালে রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) তাঁকে বিজ্ঞানের অধ্যাপক পদে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন, এবার রামেন্দ্রসুন্দর রাজি হলেন। বিজ্ঞান শিক্ষাকে বইয়ের পাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছিলেন তিনি, এ বিষয়ে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কলেজ তাঁর জীবনের এতখানি স্থান অধিকার করেছিল যে এমনকি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কলেজে অধ্যাপনার জন্য আশুতোষের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯০৩ থেকে ১৯১৯ সালের ৬ জুন তারিখে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন রিপন কলেজের অধ্যক্ষ।
রামেন্দ্রসুন্দরের লেখা স্কুল পাঠ্য বই বিষয়ে আলোচনা এই নিবন্ধে নেই। তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা করেন নি, কাজেই তাঁর প্রায় সমসাময়িক জগদীশচন্দ্রের মতো সে বিষয়ে লেখালেখির কথাও ওঠে না। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর বিজ্ঞান প্রবন্ধ রচনার উদ্দেশ্য সঠিক ভাবেই চিহ্নিত করেছেন। “(রামেন্দ্রসুন্দরের লেখা) পড়ে বিজ্ঞান শেখা যায় না, দেখা যায়। কারণ, রামেন্দ্রসুন্দর তো বিজ্ঞান শেখাতে চাননি, দেখাতে চেয়েছেন। … সাহিত্যিক যেমন জীবন থেকে রস সংগ্রহ করেন, রামেন্দ্রসুন্দর তেমনি রস আহরণ করেছেন বিজ্ঞান থেকে।” (বিজ্ঞান সাহিত্যে রামেন্দ্রসুন্দর, জ্ঞান ও বিজ্ঞান, অগাস্ট ১৯৬৪) রামেন্দ্রসুন্দরের নিজের কথায়, “মাদক দ্রব্যের একটা সাধারণ লক্ষণ এই যে, অপরকে না বিলাইলে আনন্দের পূর্ণতা হয় না। বিজ্ঞানামোদীও অপরকে আপনার আনন্দের ভাগ দিতে চান”। (জগদানন্দ রায়ের ‘প্রকৃতি পরিচয়” বইয়ের ভূমিকা) রামেন্দ্রসুন্দরের বিজ্ঞান বিষয়ে প্রথম বই ‘প্রকৃতি’-র সূচনাতে তিনি লিখেছিলেন, “পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণের আয়াসলব্ধ বৈজ্ঞানিক সত্যগুলি মানবজাতির সাধারণ সম্পত্তি”, সেই সম্পত্তি তিনি সব বাঙালীর মধ্যে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি লিখেছিলেন, “বাঙ্গালা ভাষায় সাধারণ পাঠকের নিকট বিজ্ঞান প্রচার বোধহয় অসাধ্যসাধনের চেষ্টা; সিদ্ধিলাভের ভরসা করিনা।” তাঁর মৃত্যুর একশো বছর পরে বাংলার বিজ্ঞান সাহিত্যে তাঁর অবদানকে আমরা ফিরে দেখব।
রামেন্দ্রসুন্দরের ধ্যানজ্ঞান ছিল মাতৃভাষা, তিনি ক্লাসে বাংলায় পড়ানো শুরু করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “অধ্যাপকের আসনে বসিয়া বাঙ্গালা ভাষায় অধ্যাপনা যদি আপনারা অপরাধ বলিয়া গণ্য করেন, তাহা হইলে আমার মত অপরাধী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঙ্ঘমধ্যে খুঁজিয়া মিলিবে না।” একাধিকবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতাদানের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ নিয়মানুসারে সেই বক্তৃতা দিতে হবে ইংরাজিতে। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে বাংলাতে বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠার অল্পদিনে পরেই তিনি তার সভ্য হয়েছিলেন। একবছরের মধ্যেই তিনি হয়েছিলেন পরিষদের অন্যতম সম্পাদক। আমৃত্যু তিনি পরিষদের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। বাংলায় বৈজ্ঞানিক বক্তৃতা, বৈজ্ঞানিক পরিভাষা তৈরি – এ সমস্ত বিষয়ে ছিল তাঁর অসীম আগ্রহ। বাংলায় বিজ্ঞান চর্চার যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল, তার ভগীরথ ছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর।
রামেন্দ্রসুন্দরের পাণ্ডিত্য ছিল বিশাল মাপের, বিজ্ঞানের বাইরে সাহিত্য ও দর্শনের জগতে ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। আমরা এই প্রবন্ধে শুধুমাত্র তাঁর বিজ্ঞান সংক্রান্ত লেখার আলোচনার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখব। তবে এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলা প্রয়োজন। অনেকেই রামেন্দ্রসুন্দরের বিজ্ঞান ও দর্শনের মেলবন্ধনের প্রয়াসের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেও কারো কারো মতে দার্শনিক রামেন্দ্রসুন্দর শেষ পর্যন্ত তাঁর বিজ্ঞানীসুলভ মনোভাব বজায় রাখতে পারেননি, আশ্রয় নিয়েছিলেন যুক্তিনিরপেক্ষ বৈদিক অদ্বৈতবাদের কাছে। অমলকুমার মুখোপাধ্যায়েয় কথায়, “আজীবন যুক্তিবাদী রামেন্দ্রসুন্দরের এ-এক বিস্ময়কর পশ্চাদপসরণ। … যুক্তিনিরপেক্ষ বিশ্বাসের কাছে স্পষ্টতই পরাভূত হয়েছে তাঁর বিজ্ঞানমনস্কতা।” ( দার্শনিক রামেন্দ্রসুন্দর, চতুরঙ্গ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯) সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কথায়, “(শাস্ত্র গ্রন্থের অনুবাদ) করতে গিয়ে সাফাই গাইবার প্রবৃত্তিটি বোধ হয় বেদপন্থী ত্রিবেদী সন্তানের মধ্যে প্রবেশ করলো। … রামেন্দ্রসুন্দরের সমাজরক্ষণশীলতা শেষ অবধি পুরাতনী মনোভাবে পরিণত হয়েছে। … বর্তমান বিজ্ঞানের আবশ্যিকতা রামেন্দ্রসুন্দর স্বীকার করিতেন না। … মাঝে মাঝে মনে হয় ত্রিবেদী মশায়ের মতো তত্ত্বজিজ্ঞাসু শিক্ষক যদি রিপন কলেজের মত স্থানে না কাটিয়ে এমন কোনো স্থানে অধ্যাপনা করতেন – দেশের নবীন মনের সঙ্গে যেখানে সাক্ষাৎ হওয়া সম্ভব ছিল, তাহলে এই সাময়িক একদেশদর্শী তর্করাশির পরিবর্তে হয়তো চিরস্থায়ী মৌলিক অবদান আমরা তাঁর কাছ থেকে পেতে পারতাম। … খুব কম প্রবন্ধ পড়ি যাতে তাঁর গভীর সংস্কারমুক্ত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মৌলিক চিন্তার সাক্ষ্য দেয়।” (আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর, জ্ঞান ও বিজ্ঞান, অগাস্ট ১৯৬৪)। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা বর্তমান নিবন্ধের সীমার বাইরে।
তাহলে বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যে রামেন্দ্রসুন্দরের অবদান কী? আবার সত্যেন্দ্রনাথের কথায় ফিরে আসি। “বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বঙ্গমাতাকে যে সুন্দর উপহার দিয়েছেন – স্বচ্ছ গতিশীল ভাষা যা বিজ্ঞানের দুর্জ্ঞেয় রাজত্ব থেকে অবলীলাক্রমে ঘরের কোণে পরিচিত বস্তুর বর্ণনায় চলে আসতে পারে, তার জন্যেই দেশ তাঁর কাছে চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে।” তাঁর অনায়াসপাঠ্য প্রবন্ধ শিক্ষিত বাঙালীর সামনে বিজ্ঞানের স্বাদ এনে দিয়েছিল। কয়েকটা উদাহরণ থেকেই তা স্পষ্ট হবে।
সহজ কথায় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা কাকে বলে বোঝাতে বসেছেন রামেন্দ্রসুন্দর। “জলের ভিতর hydrogen oxygen আছে, তা না জানা সত্ত্বেও পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের জীবনযাত্রা এতকাল চলিয়াছে ও চলিতেছে। … বৈজ্ঞানিক কিন্তু আপনার laboratory-ঘরে তাড়িত-প্রবাহ দ্বারা বিশ্লিষ্ট করিয়া, পথিকদিগকে ডাকিয়া আনিয়া দেখান … জল হইতে hydrogen oxygen বাহির করিতে হইলে হাত, পা, দাঁত নখ প্রভৃতি কর্মেন্দ্রিয়ে কুলায় না; তাহার জন্য বিশিষ্ট রকমের হাতিয়ার বা tool তৈরি করিতে হয়, যন্ত্র-তন্ত্র, তোড়জোড় আবশ্যক হয়। … এইরূপ যন্ত্র-তন্ত্র, তোড়জোড় সাহায্যে যে observation, তাহার নাম experiment বা পরীক্ষা।” (বাঙ্ময় জগৎ, বিচিত্র জগৎ)তরলের ধর্ম সম্পর্কে লিখছেন, “তরল পদার্থের হাতের কাছে উদাহরণ জল। কঠিনের সঙ্গে ইহার প্রভেদ কী? প্রভেদ অনেক। জল গড়াইয়া যায়, জলে স্রোত হয়: জল ফোঁটা ফোঁটা পড়ে; জলে অক্লেশে হাত ডুবাও। জল সেখান হইতে সরিয়া যাইবে, আবার হাত তোল, জল দ্বিধা না করিয়া স্বস্থানে আসিয়া স্থান পূরণ করিবে; … জল যে এইরূপ অবাধে সরিয়া নড়িয়া বহিয়া যায়, ইহাই জলের তারল্য।” (তরল পদার্থ, জগৎ-কথা) সাধুভাষা সত্ত্বেও এ যেন আধুনিক লেখকের লেখা।
এই প্রসঙ্গে তুলনা করুন পরমাণু সম্পর্কে অক্ষয়কুমার ও রামেন্দ্রসুন্দরের লেখার। অক্ষয়কুমার লিখছেন, “স্বর্ণ, রৌপ্য, লৌহ, প্রস্তর, জল, অস্থি, মাংস, শিরা, রক্ত আদি যত জড় বস্তু আছে, সমুদায়ই অত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরমাণুর সমষ্টি। এই যে সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্রাদি বিশিষ্ট আশ্চর্য জগৎ, ইহা কেবল পরমাণুপুঞ্জ মাত্র।” (পদার্থবিদ্যা) পক্ষান্তরে রামেন্দ্রসুন্দরের ভাষায়, “কয়লা কতিপয় কয়লাখণ্ডের সমষ্টি, … সেই খণ্ডগুলিকে কাটিয়া ভাঙ্গিয়া গুঁড়া করিয়া কোনরূপে ক্ষুদ্রতর ভগ্নাংশে পরিণত করা চলে না। … মূল পদার্থের এই সকল সূক্ষ্মতম খণ্ডের নাম দেওয়া হইয়াছে পরমাণু।” (রাসয়ানিক সম্মিলন, জগৎ-কথা) স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে রামেন্দ্রসুন্দরের রচনায় ভাষা অনেক বহমান; অবশ্য তার পিছনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা গদ্যের পরিবর্তনের ভূমিকাকে অস্বীকার করা যাবে না।
রামেন্দ্রসুন্দর উদাহরণ ব্যবহার করতেন সাধারণ জীবন থেকে। প্রাচীন কালের ভূকেন্দ্রিক সৌরজগতের মডেলের একটা প্রধান অঙ্গ ছিল এপিসাইকল। রামেন্দ্রসুন্দর বুধগ্রহের এপিসাইকল বোঝাতে গিয়ে লিখেছেন, “একখানা বড়ো চাকা পৃথিবীকে কেন্দ্রে রাখিয়া তিন-শ পঁয়ষট্টি দিনে ঘুরিতেছে, ও আর একখানা ছোট চাকা সেই বড় চাকারই পরিধিস্থিত একটি বিন্দুকে কেন্দ্রগত করিয়া স্বতন্ত্র ভাবে আটাশি দিনে অপেক্ষাকৃত দ্রুতবেগে ঘুরিতেছে।”(প্রাচীন জ্যোতিষ, প্রকৃতি)। লামার্কের বিবর্তন তত্ত্ব সম্পর্কে লিখছেন, “হাতুড়ি পিটিয়া কামারের ও লাঙ্গল ধরিয়া চাষার হাতের পেশীগুলা মোটা ও শক্ত হয়, এবং কামারের ছেলে ও চাষার ছেলে এই পেশীর সবলতা উত্তরাধিকারসূত্রেই প্রাপ্ত হয়, সর্বসাধারণের সংস্কার এইরূপ।” (মৃত্যু, প্রকৃতি)
বিজ্ঞানকে সাধারণের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য রামেন্দ্রসুন্দর বিজ্ঞানের ইতিহাসকে নানা সময়ে কাজে লাগিয়েছেন। সৌরজগতের ইতিহাস, বিবর্তনতত্ত্ব বা জ্যোতির্বিদ্যার আলোচনা প্রসঙ্গে বিজ্ঞানের ধারণা কেমনভাবে পরিবর্তন হয়েছে, সে কথা ঘুরে ফিরে এসেছে। পাশাপাশি বলতে হবে তাঁর রসবোধের কথা। ষোড়শ শতাব্দীতে বিশপ জেমস আশার ঠিক করেছিলেন পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে ৪০০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ২২ অক্টোবর। রামেন্দ্রসুন্দর লিখছেন, ‘এরূপ প্রাজ্ঞের অস্তিত্বও বিরল নহে, যাঁহারা কররেখা বা ললাটরেখামাত্র দেখিয়া নষ্টকোষ্ঠী উদ্ধার করিয়া জন্মকালের রাশি নক্ষত্র নির্দেশ করিয়া থাকেন। বোধ হয় এই পদ্ধতিরই কোনরূপ বিচারের দ্বারা এককালে স্থির হইয়াছিল বসুন্ধরার বয়ঃক্রম ছয় হাজার বৎসরমাত্র। আমরা এই সকল কোষ্ঠী-উদ্ধারকের ক্ষমতার প্রশংসা করি; কিন্তু তাঁহাদের অবলম্বিত বিচারপ্রণালীর মাহাত্ম্য আমাদের মস্তিষ্কে আসেনা।” (পৃথিবীর বয়স, প্রকৃতি) বিজ্ঞান রচনার শুষ্কতা দূর করে তাঁর লেখাকে সর্বজনগ্রাহ্য করেছে তাঁর রচনাশৈলীর এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য।
উপরের একটি উদ্ধৃতিতে দেখলাম বর্ণীকরণ ছাড়াই সরাসরি ইংরাজি শব্দের ব্যবহার করেছেন রামেন্দ্রসুন্দর– এ বাপারে তাঁর মত কী? এই লেখার সময় তিনি অসুস্থ ছিলেন, অনেক প্রবন্ধ তিনি মুখে মুখে বলেছে। অন্য একটি বই, ‘বিচিত্র-প্রসঙ্গ’, তার ভূমিকাতে রামেন্দ্রসুন্দর লিখেছেন, “অনেক ইংরাজি শব্দ কথার মুখে ব্যবহার করিতে হইয়াছে। … তাহার কতক রাখিয়া গিয়াছেন। ইহা রুচিবিরুদ্ধ।” ‘বিচিত্র জগৎ’ বইটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশিত। হয়তো সুযোগ থাকলে তিনি পরিবর্তন করতেন।
বৈজ্ঞানিক পরিভাষা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন রামেন্দ্রসুন্দর। তাঁর মত, “প্রত্যেকটি শব্দ একটি নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহার করিবে; সেই শব্দটি আর দ্বিতীয় অর্থে প্রয়োগ করিবে না, এবং সেই অর্থে দ্বিতীয় শব্দের প্রয়োগ করিবে না।” (বৈজ্ঞানিক পরিভাষা, শব্দ-কথা) তাঁর নির্দিষ্ট মত আছে এ বিষয়ে, যা তিনি জোরের সঙ্গে প্রকাশ করছেন। “একটি ধাতুর নাম Ruthenium; ইংরেজের ছেলেই বল আর বাঙ্গালীর ছেলেই বল, যে রসায়ন-শাস্ত্র অধ্যয়ন করে নাই, এই শব্দের উচ্চারণে তাহার মনে কোন ভাবের উদয় হয় না। … সুতরাং উহা যখন ইংরেজীতে চলিবে তখন বাঙ্গালায় চলিবে না কেন? … উহাকে অক্ষরান্তরিত করিলেই যথেষ্ট।” (রাসয়ানিক পরিভাষা, শব্দ-কথা) কিন্তু Oxidation, Distillation জাতীয় প্রক্রিয়া বা Element, Compound ইত্যাদি জাতিবাচক বা শ্রেণীবাচক শব্দ, “ইহাদেরও অনুবাদ আবশ্যক; হরপ বদলাইলে চলিবে না।” সংস্কৃত ভাষাতে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হয়েও সেই ভাষা অবলম্বনে পরিভাষা সৃষ্টির চেষ্টাকে তিনি বাহাদুরী আখ্যা দিয়েছেন, তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেননি। “Oxygen ও Nitrogenএর অনুবাদে অম্লজান ও যবক্ষারজান, এই দুই নামের কল্পনা কেন হইয়াছিল বলিতে পারিনা। ঐরূপ অনুবাদের কোন বিশেষ উপযোগিতা ছিল না।” শেষে লিখছেন, “আমাদের দেশে এ পর্যন্ত পরিভাষা সঙ্কলনের যে কিঞ্চিৎ চেষ্টা হইয়াছে, তাহাতে নামের সার্থকতা রক্ষার জন্য একটা উৎকট প্রয়াস দেখা যায়। … পারিভাষিক নামের সার্থকতা থাকিবার কোন প্রয়োজন নাই, এই কথাটি সর্বদা মনে রাখা আবশ্যক।” এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, “পারিভাষিক শব্দগুলি ইংরাজি রাখিয়াই এবং সাংকেতিক চিহ্নগুলি ইংরাজি রাখিয়াই আর সমস্ত কথা বাংলায় প্রকাশ করা যাইতে পারে।” শব্দ-কথা বইয়ের মধ্যে স্থান পেয়েছে শারীরবিজ্ঞান, রসায়ন ও বৈদ্যক পরিভাষা বিষয়ে আলাদা আলাদা প্রবন্ধ। ভূগোলের পরিভাষা নিয়েও তিনি কলম ধরেছিলেন। পরিভাষা বিষয়ে তাঁর প্রয়াস বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম অবদান। বিজ্ঞান বিষয়ে রচনা স্বাভাবিকভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রয়োজনীয়তা হারায়, কিন্তু রামেন্দ্রসুন্দরের নির্মিত বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ও আরো বিশেষ করে বললে তার নিয়মাবলী বাংলা ভাষার স্থায়ী সম্পদ।
এখানে একটা কথা হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না– রামেন্দ্রসুন্দরের বিজ্ঞান অন্যব প্রবন্ধেও স্থান করে নিয়েছে। বিদ্যাসাগরের জীবন সম্পর্কে তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করা যাক, “অণুবীক্ষণ নামে একরকম যন্ত্র আছে, তাহাতে ছোট জিনিসকে বড় করিয়া দেখায়, বড় জিনিসকে ছোট দেখাইবার নিমিত্ত উপায় পদার্থ বিদ্যাশাস্ত্রে নির্দিষ্ট থাকলে ওই উদ্দেশ্যে কোন যন্ত্র আমাদের মধ্যে সর্বদা ব্যবহৃত হয়না। কিন্তু বিদ্যাসাগরের জীবন চরিত বড় জিনিসকে ছোট দেখাইবার জন্য নিমিত্ত যন্ত্রস্বরূপ।” (ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, চরিত কথা)
বিজ্ঞান বিষয়ে লেখার এক আবশ্যিক শর্ত হল বিজ্ঞান জগতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, রামেন্দ্রসুন্দর তা রেখেছিলেন। দুই একটা উদাহরণ থেকে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। ‘প্রকৃতি’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৯৬ সালে। লেখাগুলি দশ বছর ধরে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯০৯ সালে। বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রেই জানেন যে এই মধ্যবর্তীকালীন সময় বিজ্ঞানের জগতে বিপ্লবের যুগ। রামেন্দ্রসুন্দর সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন। লেখক দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন যে এই ক’বছরে বিজ্ঞানের জগতে অনেক পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও বইটির সম্পূর্ণ সংস্কারের সুযোগ হয়নি। তাঁর ইচ্ছা ছিল আমূল সংস্কারের, সে সুযোগ আর আসেনি। তবু দ্বিতীয় সংস্করণে দেখি প্রয়োজনে পাদটীকা যোগ করে লেখক স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। ‘আকাশ-তরঙ্গ’ প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ প্রসঙ্গে, সেখানে এসেছে ইথার মাধ্যমের কথা। দ্বিতীয় সংস্করণে শেষে যোগ করেছেন, ‘মনে রাখিতে হইবে, এই প্রবন্ধটি ষোল বৎসর পূর্বে লিখিত, উহা এখন পুরাতন ইতিহাস।” কেন তা ‘পুরাতন ইতিহাস’ সে কথা পাদটীকার ক্ষুদ্র পরিসরে রামেন্দ্রসুন্দর লেখার সুযোগ পাননি, বিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রেই আজ তা জানেন। ইতিমধ্যে ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব প্রকাশ করেছেন, ইথার মাধ্যমের ধারণার স্থান হয়েছে বিজ্ঞানের আস্তাকুঁড়ে।
লর্ড কেলভিন পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছিলেন যে পৃথিবী ক্রমাগত ঠাণ্ডা হচ্ছে, তার এখন যা তাপমাত্রা, তাতে কিছুতেই তার বয়স দশ কোটি বছরের বেশি হবে না। অথচ ভূবিদ্যা ও বিবর্তনের হিসাবে পৃথিবীর বয়স অনেক গুন বেশি। এই সমস্যাটি নিয়ে ‘প্রকৃতি’র পরের প্রবন্ধ ‘পৃথিবীর বয়স’ লেখা হয়েছিল ১৮৯৫ সালে, তেজস্ক্রিয়া আবিষ্কারের আগে। ভূকেন্দ্রের উত্তাপের এক প্রধান উৎস তেজস্ক্রিয়া। তাই দ্বিতীয় সংস্করণে পাদটীকা, ‘অধুনা রেডিয়াম নামক অদ্ভুত ধাতুর আবিষ্কারের ফলে লর্ড কেল্‌বিনের হিসাব উলট-পালট হইয়া গিয়াছে।”
বাংলা ভাষায় সাধারণের মধ্যে বিজ্ঞান প্রসারের সেই ‘অসাধ্যসাধন’ তিনি শেষ পর্যন্ত করেছিলেন। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে তাঁর বিজ্ঞানবিষয়ে রচনার সামান্যই পরিচয় দেওয়া সম্ভব হল। তাঁর লেখার তালিকা থেকে আমরা দেখতে পাই বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে রামেন্দ্রসুন্দরের কৌতূহল ছিল। এই প্রবন্ধের অনেক তথ্য ও মতামত নিচের উৎসগুলি থেকে নেওয়া হয়েছে। উৎসাহী পাঠকপাঠিকাদের সেগুলি পড়তে অনুরোধ করি।

তথ্যসূত্র : ১। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, সব্যসাচী রায়চৌধুরী ২। বাংলার নবজাগরণে বিজ্ঞান চেতনা, অসীমকুমার মুখোপাধ্যায় ৩। বিজ্ঞানভিত্তিক রচনায় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, সুজাতা বন্দ্যোপাধ্যায় (বাঙালির বিজ্ঞানচর্চাঃ প্রাক্‌স্বাধীনতা পর্ব, সম্পাদক ধনঞ্জয় ঘোষাল) ৫। বাঙালির বিজ্ঞানভাবনা ও সাধনা, অরূপরতন ভট্টাচার্য ৭। বঙ্গে বিজ্ঞানঃ উন্মেষপর্ব, আশীষ লাহিড়ী রামেন্দ্রসুন্দরের লেখার উদ্ধৃতিগুলি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রকাশিত রামেন্দ্রসুন্দর রচনাবলী থেকে নেওয়া। বানানের ক্ষেত্রে আধুনিক রূপ ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে বন্ধনীর মধ্যে প্রবন্ধ ও বইয়ের নাম দেওয়া হয়েছে।

Related Post

Add Comments