অটিজমের বিভিন্ন প্রকার 

অটিজমের বিভিন্ন প্রকার 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ আগষ্ট, ২০২৬
Default Alt Text

অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD) একটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় স্নায়ুবিকাশজনিত অবস্থা। রোগ নির্ণয় একই হলেও একেকজনের লক্ষণ, আচরণ, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক যোগাযোগের ধরন অনেকটাই ভিন্ন হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, অটিজমের পেছনে একাধিক জৈবিক কারণ কাজ করে কিনা। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণা সেই প্রশ্নের ফলপ্রসূ উত্তর দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের সংযোগ ব্যবস্থা বা ব্রেন কানেক্টিভিটি-র ভিত্তিতে অটিজমকে অন্তত দুটি স্বতন্ত্র জৈবিক উপ-ধরনে ভাগ করা সম্ভব।

গবেষকরা অটিজমে আক্রান্ত শত শত ব্যক্তির ফাংশনাল এমআরআই (fMRI) স্ক্যান বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি জিনগতভাবে পরিবর্তিত একই ধরনের বৈশিষ্ট্যযুক্ত ইঁদুরের মডেলও পরীক্ষা করা হয়। মানুষের তথ্য ও প্রাণী মডেলের ফলাফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে তারা দুটি ভিন্ন ধরনের মস্তিষ্ক সংযোগের ধরণ শনাক্ত করেন, যা অটিজমের জৈবিক বৈচিত্র্যকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

প্রথম উপ-ধরনটির নাম হাইপোকানেক্টিভিটি। এই ধরনের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান তুলনামূলকভাবে কম হয়। বিশেষ করে নিউরনের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা যুক্ত রাখা সিন্যাপটিক পথ বা সংযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন দেখা যায়। গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, এই উপ-ধরনের সঙ্গে এমন কিছু জিনের সম্পর্ক রয়েছে, যা নিউরনের পারস্পরিক সংযোগ তৈরি এবং স্নায়ু সংকেত পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ, এই ধরনের অটিজমে মস্তিষ্কের যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট জিনগত কারণ থাকতে পারে।

দ্বিতীয় উপধরনটি হলো হাইপারকানেক্টিভিটি। এখানে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মাত্রায় যোগাযোগ ঘটে। এই উপ-ধরনের সঙ্গে মূলত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম-সম্পর্কিত জিন এবং জৈবিক প্রক্রিয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, এই দলের ব্যক্তিদের মধ্যে অটিজমের তীব্রতা পরিমাপের কিছু ক্লিনিক্যাল সূচকে তুলনামূলকভাবে সামান্য বেশি স্কোর দেখা যায়। যদিও এই পার্থক্য খুব বড় নয়, তবুও এটি বুঝিয়ে দেয় যে মস্তিষ্কের সংযোগের ধরন ও উপসর্গের মধ্যে বাস্তব জৈবিক সম্পর্ক থাকতে পারে। এ

গবেষণার অন্যতম বড় শক্তি হলো, মানুষের পাশাপাশি ইঁদুরের মডেলেও একই ধরনের উপ-ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে এটি কেবল আচরণগত পার্থক্যের ওপর নয়, বরং প্রকৃত জৈবিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে অটিজমকে বোঝার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। গবেষকদের মতে, এটি ভবিষ্যতে অটিজমের কারণ অনুসন্ধান এবং নতুন চিকিৎসা কৌশল উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বিশ্লেষণ করা রোগীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ক্ষেত্রে এই গবেষণায় শনাক্ত উপ- ধরন দুটি প্রযোজ্য ছিল। অর্থাৎ, অটিজমের আরও অনেক জৈবিক উপধরন এখনও আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে এই ফলাফল প্রিসিশন মেডিসিন বা ব্যক্তি- নির্দিষ্ট চিকিৎসা অভিমুখে এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ভবিষ্যতে রোগীর মস্তিষ্কের সংযোগের ধরন ও জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত থেরাপি বা সহায়তা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে। একই চিকিৎসা-পদ্ধতির পরিবর্তে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা দেওয়ার পথও এর মাধ্যমে খুলে গেল।

মোদ্দাকথা ,অটিজম কোনো একক রোগ নয়, এটি একাধিক জৈবিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অবস্থার সমষ্টি হিসাবেই বিবেচ্য ।

 

সূত্র: Pagani et al., “Cross-species identification of autism subtypes based on brain connectivity,” Nature Neuroscience (2026).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + 18 =