অনামা সিংহের থাবা : আইজ্যাক নিউটন 

অনামা সিংহের থাবা : আইজ্যাক নিউটন 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ২২ মে, ২০২৬

সালটা ১৬৯৭ । ইউরোপের গণিত জগৎ তখন তুমুল বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিযোগিতার এক যুগ পার করছে। ঠিক সেই সময় প্রসিদ্ধ সুইস গণিতবিদ জোহান বার্নৌলী ইউরোপের বড় বড় গণিতবিদদের সামনে ছুড়ে দিলেন এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ। সে এমন এক সমস্যা যার সমাধান অত্যন্ত মেধাবী মস্তিষ্ক ব্যতীত কিছুতেই সম্ভব নয়। সমস্যাটি সমাধানের জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল ছয় মাস। উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপের সেরা গণিতবিদদের প্রকৃত সামর্থ্য যাচাই করা। সেই সময় গণিতের জগতে এই ঘটনাটি এক বিশাল আলোড়ন ফেলেছিল। চ্যালেঞ্জটি ইউরোপের বহু গণিতবিদের কাছে পৌঁছেছিল। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ঘটনাটা ঘটে যখন সমস্যাটি পৌঁছাল আইজ্যাক নিউটনের হাতে।

তখন নিউটনের বয়স ৫৪ বছর। ইতিমধ্যেই তিনি বিজ্ঞানের জগতে এক জীবন্ত কিংবদন্তি। ইউরোপ জুড়ে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাত। মহাকর্ষ সূত্র, গতি সূত্র, আলোক বিজ্ঞানের সূত্র সহ বহু আবিষ্কারের মাধ্যমে ততদিনে তিনি নিজের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণ অক্ষরে লিখে ফেলেছেন। সেই সময় তিনি সরকারি টাঁকশালে ওয়ার্ডেনের কাজ করতেন। দিনের বড় একটা অংশ তাঁকে প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো।

সেরকমই এক দীর্ঘ কর্মব্যস্ত দিবস শেষে বিকেল চারটের দিকে নিউটনের হাতে পৌঁছায় বার্নৌলীর সেই বিখ্যাত সমস্যা। আশ্চর্য ! তিনি রাতারাতিই সেই অত্যন্ত দুরূহ গাণিতিক সমস্যাটি সমাধান করে ফেললেন। পরদিন সকালে নিজের নাম প্রকাশ না করে সমাধানখানা পাঠিয়ে দিলেন ।

সমাধানটি দেখা মাত্র বারনৌলী বুঝে গেলেন, এ নিউটন ছাড়া আর কারোর কাজ হতেই পারে না। কারণ সমাধানটির ভেতরে ছিল অসাধারণ সাযুজ্যপূর্ণ নিখুঁত যুক্তি। ওই পর্যায়ের গাণিতিক দক্ষতা কেবল নিউটনের পক্ষেই সম্ভব। নিউটনের গাণিতিক প্রতিভার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বার্নৌলী সেদিন একটা কথা বলেছিলেন যা ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে – থাবার ছাপ দেখলেই সিংহকে চেনা যায়।

এই ঘটনার মধ্যে শুধু প্রতিভা নয়, আছে জ্ঞানের সৌন্দর্যও। কী ছিল সেই সমস্যা? তার নাম ব্র্যাকিস্টোক্রোন সমস্যা। নামটা বেশ খটমট হলেও , এই সমস্যার মূল প্রশ্নটি ছিল খুবই সহজ। ধরা যাক, একটি বল মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে ঘর্ষণ ছাড়া এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গড়িয়ে যাবে। প্রশ্ন হলো, কোন ধরনের পথ ধরে গেলে বলটি সবচেয়ে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে?

প্রথমে মনে হতেই পারে, সরলরেখাই তো গন্তব্যে পৌঁছানোর সবচেয়ে দ্রুত পথ। কিন্তু প্রকৃত উত্তরটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গণিতের ক্ষেত্রে, সবচেয়ে দ্রুত পথ সরলরেখা নয়। এর ঠিক উত্তরটি হলো, ‘সাইক্লয়েড’ নামক একটি বিশেষ বক্ররেখা।

সাইক্লয়েড হলো এমন একটি রেখা, যা তৈরি হয় যখন একটি বৃত্ত গড়িয়ে সামনে এগোয় এবং বৃত্তের কিনারায় থাকা একটি বিন্দুর গতিপথ আঁকা হয়। এই পথের বিশেষত্ব হলো, শুরুতে এটি খুব খাড়া ভাবে নীচে নামে। ফলে বলটির গতি খুব দ্রুত থাকে। পরে সেই বাড়তি গতি বলটিকে দ্রুত সামনে এগিয়ে দেয়। যদিও পথটি সরলরেখার তুলনায় একটু দীর্ঘ, কিন্তু শুরুতেই বেশি গতি পাওয়ার কারণে মোট সময়টা কম লাগে। এই ধারণাটা আমাদের স্বাভাবিক চিন্তাবিরুদ্ধ – আর সেখানেই সমস্যাটি্র আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

এই সমস্যাটি এক মামুলি ধাঁধা ছিল না; এটি গণিতের নতুন এক যুগের সূচনা করেছিল। এই ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য যে গাণিতিক পদ্ধতি প্রয়োজন, সেটি তখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরে এই শাখাটিই “ক্যালকুলাস অব ভ্যারিয়েশনস’’ নামে পরিচিত হয়। নিউটন এই সমস্যাটি এক রাতের মধ্যে সমাধান করেছিলেন এমন ক্যালকুলাস/ কলনবিদ্যা ব্যবহার করে, যার ভিত্তি তিনিই বহু বছর আগে তৈরি করেছিলেন।

নিউটনের কৃতিত্ব যে শুধুমাত্র একটা জটিল সমস্যার সমাধান তা একেবারেই নয়। সবচেয়ে চমকের বিষয় হলো নিশ্চুপে তাঁর আত্মগোপনীয়তাটা। তিনি চাইলেই নিজের নাম ঘোষণা করে ইউরোপ জুড়ে আরও প্রশংসা অর্জন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। কেন তিনি এমন করেছিলেন, তা আজও নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। সে নিয়ে আবার নানা মুনির নানা মত। কারোর মনে হয়েছে, হয়তো তিনি অহংকার ঘোষণা থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি না থাকলে এই সমস্যার সমাধান হবেই না – এ হেন আত্মম্ভরিতা জাহির করতে চাননি। হয়তো বা প্রতিযোগিতার উত্তেজনা উপভোগ করেছিলেন। অথবা হয়তো তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত প্রতিভার পরিচয়ের জন্য স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয় না। কাজই মানুষের আসল পরিচয়।

এই গাণিতিক সমাধানের ইতিহাস আমাদের কিছু সত্যিকারের মূল্যবোধ উপহার দিল। প্রকৃত মেধাকে কখনও চিৎকার করে ‘আমি করেছি আমি করেছি’ বলে নিজের পরিচয় দিতে হয় না। খাঁটি প্রতিভা নিজের শক্তি, নিজের বিশেষত্ব প্রমাণ করে তার কাজের মাধ্যমে। নিউটনের সমাধান ছিল এতটাই অনন্য, এতটাই নিখুঁত যে বার্নৌলী শুধু সমাধান দেখেই বুঝে গিয়েছিলেন সেটা কার কাজ হতে পারে।

এককথায় বলতে গেলে , ‘সিংহকে নিজের নাম সই করতে হয় না।’ বাক্যটি শুধু নিউটনের জন্য নয়। যেকোনো প্রকৃত প্রতিভাবান মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। যে মহান তাকে তার সৃষ্টি দিয়েই চেনা যায়। নিউটনের সেই এক রাতের সমাধান আজও গণিতের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে, কারণ সেটা তো শুধু একটা সমস্যার উত্তর নয়, সেটা খাঁটি মানবমেধার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fifteen + 13 =