আগে থেকেই হুঁশিয়ার বামন বেজি

আগে থেকেই হুঁশিয়ার বামন বেজি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ জুন, ২০২৬

বিপদ সামনে না এলেও তার আভাস অনেক সময় আগেই পাওয়া যায়। মানুষ যেমন সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা ভেবে আগে থেকেই সতর্ক হয়, তেমনই প্রাণীরাও অনেক সময় সংঘাতের আশঙ্কা টের পেয়ে নিজেদের আচরণ বদলে ফেলে। আফ্রিকার ক্ষুদে মাংসাশী প্রাণী ডোয়ার্ফ মঙ্গুজ বা বামন বেজির উপর নতুন এক গবেষণা সেই ছবিই তুলে ধরেছে। দেখা গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনও দল কাছাকাছি থাকলে বামন বেজিরা শুধু সংঘর্ষের সময় নয়, তার অনেক আগেই নিজেদের চলাফেরা, যোগাযোগের ধরন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা বদলে ফেলে। এমনকি আশপাশে শত্রুপক্ষের কোনও সদস্য চোখে না পড়লেও তারা সম্ভাব্য বিপদের হিসাব কষে সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি দক্ষিণ আফ্রিকার বন্য পরিবেশে প্রায় এক দশক ধরে চলেছে। এতদিন বিজ্ঞানীরা মূলত শিকারি প্রাণীর ভয়ে অন্য প্রাণীদের আচরণ কেমন বদলে যায়, তা নিয়ে গবেষণা করেছেন। একে ‘ল্যান্ডস্কেপ অব ফিয়ার’ বা ভয়ের ভূদৃশ্য বলা হয়।

নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, একই প্রজাতির প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলিও প্রাণীদের দৈনন্দিন আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। ডোয়ার্ফ মঙ্গুজ আফ্রিকার সবচেয়ে ছোট মাংসাশী প্রাণী। তারা সাধারণত ৫ থেকে ৩০ সদস্যের দলে বাস করে এবং নিজেদের এলাকা রক্ষা করে। প্রতিবেশী দলের সঙ্গে সংঘর্ষ তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এসব লড়াইয়ে আঘাত লাগা বা মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। গবেষকরা ১২টি বন্য মঙ্গুজ দলের উপর নজর রাখেন। এই সময়ে তারা ১,৬০০-র বেশি দৈনন্দিন চলাচলের তথ্য, ১৬,০০০-এর বেশি প্রহরী আচরণের পর্যবেক্ষণ এবং ২,০০০-এর বেশি বার ঘুমানোর গর্তে ফেরার তথ্য সংগ্রহ করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বেশিরভাগ তথ্যই সংগ্রহ করা হয়েছে এমন সব দিনে , যখন কোনও সরাসরি সংঘর্ষ ঘটেনি। দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের আকার বেজিদের আচরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বড় দল সাধারণত সংঘর্ষে জিতে যায়। তাই বড় প্রতিপক্ষের এলাকায় গেলে মঙ্গুজরা বেশি সতর্ক থাকে। দলের সদস্যদের মধ্যে কেউ একজন উঁচু জায়গায় উঠে চারপাশে নজর রাখে এবং মাঝেমধ্যে বিশেষ ধরনের সংকেতধ্বনি দেয়। প্রতিপক্ষের দল যত বড় হয়, এই সতর্কবার্তার হারও তত বাড়ে। তবে ঘুমানোর জায়গা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা অন্য ধরনের হিসাব করে। গবেষণায় দেখা গেছে, সমান শক্তিশালী বা কাছাকাছি আকারের প্রতিদ্বন্দ্বী দলের এলাকায় রাত কাটাতে তারা সবচেয়ে বেশি অনীহ। কারণ এমন প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে গর্তের কাছে হামলা হলে পালানোর সুযোগ কম থাকে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, এলাকার সীমানা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশ। কিন্তু গবেষণার ফলাফল ছিল কিছুটা জটিল। সীমানার কাছে রাত কাটালে মঙ্গুজরা গর্তে ফিরতে দেরি করলেও সেখানে প্রহরী আচরণ সবসময় বেশি দেখা যায়নি। অর্থাৎ, ঝুঁকি নির্ধারণে শুধু ভৌগোলিক অবস্থান নয়, প্রতিদ্বন্দ্বীর শক্তি ও অন্যান্য পরিবেশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। এই গবেষণা দেখায় যে প্রাণীরা কেবল তাৎক্ষণিক বিপদের প্রতিক্রিয়া জানায় না; তারা ভবিষ্যৎ সংঘাতের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখে। বিশেষ করে ছোট দলগুলি কীভাবে বড় ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মধ্যেও টিকে থাকে, তা বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছে। প্রকৃতির জগতে সংঘাত একটি নিত্যদিনের বাস্তবতা। ডোয়ার্ফ মঙ্গুজদের আচরণ বলছে, লড়াই শুরু হওয়ার অনেক আগেই তার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়।

 

সূত্র: Earth . com ; June ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − thirteen =