আলাস্কার প্রত্যন্ত আর্কটিক অঞ্চলে গত এক দশকে এক অদ্ভুত পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। একসময় স্বচ্ছ যেসব নদী শীতল তুন্দ্রা অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যেত, তাদের অনেকেই ধীরে ধীরে ঘোলা কমলা রঙ ধারণ করতে শুরু করে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, যেন নদীর জলে মরিচা পড়েছে । দীর্ঘদিন ধরে এর কারণ নিয়ে নানা অনুমান থাকলেও এবার গবেষকেরা নিশ্চিতভাবে জানিয়েছেন—এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গলতে থাকা পারমাফ্রস্ট/ চিরহিমায়িত ভূমি।
কমিউনিকেশন্স আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট পত্রিকাতে গবেষণাটি বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে ফুটে উঠেছে, আলাস্কার আর্কটিক অঞ্চলের হাজার হাজার বছর ধরে বরফে আবদ্ধ মাটি ও শিলা দ্রুত গলতে শুরু করেছে। এর ফলে বাতাস ও জলের সংস্পর্শে এসে ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা লৌহসমৃদ্ধ খনিজ অংশ নিচ্ছে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় । আর সেই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ লৌহ কণা, যা নদীর রঙকে কমলা করে তুলছে।
তবে এই ঘটনা শুধু একটি রঙের পরিবর্তন নয়; এর প্রভাব পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর পড়ছে। জলে ভাসমান সূক্ষ্ম লৌহকণা মাছের ফুলকা বন্ধ করে দিতে পারে, নদীর তলদেশে জমে শৈবাল ও ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীর বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে, খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে স্যামন মাছের মতো প্রজাতির জন্য এটি বড় বিপদ, কারণ তাদের ডিম পাড়ার জন্য পরিষ্কার কংকরযুক্ত নদীতল প্রয়োজন।
গবেষণায় দেখা গেছে, আলাস্কা বর্তমানে বিশ্বের অনেক অঞ্চলের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। এই উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুটি ভিন্ন প্রক্রিয়ায় নদীতে লোহা প্রবেশ করছে।
উচ্চভূমিতে সমস্যা শুরু হচ্ছে পাইরাইট বা তথাকথিত “ফুল’স গোল্ড” খনিজ থেকে। দীর্ঘদিন বরফের নীচে আটকে থাকা এই খনিজ যখন অক্সিজেন ও জলের সংস্পর্শে আসে, তখন তা ভেঙে সালফিউরিক অ্যাসিড, লোহা এবং অন্যান্য ধাতব উপাদান তৈরি করে। পরে সেই লোহা জারিত হয়ে মরিচার মতো কমলা কণায় পরিণত হয়।
অন্যদিকে নীচু জলাভূমি অঞ্চলে অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে কিছু অণুজীব শক্তি উৎপাদনের জন্য লোহা ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়ায় জলে দ্রবণীয় লোহা তৈরি হয়, যা নদীতে এসে অক্সিজেনের সংস্পর্শে আবার মরিচায় রূপ নেয়।
গবেষকদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই পরিবর্তন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। কমলা নদীগুলোর বিস্তার এমন সব এলাকায় দেখা যাচ্ছে, যেখানে পারমাফ্রস্ট দ্রুত গলছে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
তবে গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আশার কথাও বলছে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে মাটির তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ করে ভবিষ্যতে কোন এলাকায় নদীদূষণের ঝুঁকি বাড়তে পারে, তা আগাম অনুমান করা সম্ভব। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ মাছের আবাস এলাকা, জলের উৎস এবং স্থানীয় সম্প্রদায়কে আগে থেকেই সতর্ক করা যাবে।
গবেষকরা বলেন, একবার কোনো নদী “মরিচা ধরা” শুরু করলে সেটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কোথায় এই সমস্যা দেখা দিতে পারে তা আগে থেকে জানা গেলে অন্তত এখনও সুস্থ ও নিরাপদ নদীগুলোকে রক্ষার সুযোগ থাকবে।
আলাস্কার কমলা নদীগুলো তাই শুধু একটি ভূতাত্ত্বিক বা রাসায়নিক ঘটনা নয়; এগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের এক জীবন্ত সতর্কবার্তা। পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম ও মানবপ্রভাবমুক্ত অঞ্চলগুলোতে যখন বিশ্ব উষ্ণায়নের ছাপ পড়ছে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়—প্রকৃতির এই পরিবর্তন থেকে সত্যিই কোনো স্থান নিরাপদ নয়।
সূত্র: Popular science
