ইউরোপ জুড়ে চলতি বছরের জুনের শেষ সপ্তাহে আঘাত হেনেছে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহ। পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের উপর তৈরি হওয়া শক্তিশালী ‘তাপ গম্বুজ’-এর প্রভাবে একাধিক দেশে ভেঙেছে তাপমাত্রার রেকর্ড। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে জার্মানি, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্রসহ নানা দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির উপরে উঠে নতুন জাতীয় বা মাসিক রেকর্ড গড়ে। শুধু দিনের তাপই নয়, রাতেও তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকায় মানুষ স্বস্তি পায়নি। এতে বিশেষ করে প্রবীণ, শিশু এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই তাপপ্রবাহের বিশেষত্ব শুধু এর তীব্রতায় নয়, সময়কালেও। সাধারণত জুন মাস ইউরোপে তুলনামূলকভাবে সহনীয় আবহাওয়ার জন্যই পরিচিত। কিন্তু এবার জুনেই এমন চরম তাপপ্রবাহ জলবায়ুর পরিবর্তিত বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন দ্রুত পরিচালিত এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, গবেষণার আওতাধীন অঞ্চলে এটি জুনের সর্বোচ্চ তাপপ্রবাহ। মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এমন চরম আবহাওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৬ সালের জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে এই মাত্রার তাপপ্রবাহ কার্যত ঘটতেই পারত না। এমনকি ২০০৩ সালের ইউরোপের প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের সময়ও এ ধরনের পরিস্থিতির সম্ভাবনা ছিল অনেক কম। বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে বর্তমানে জুন মাসে এমন তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা কয়েক দশক আগের তুলনায় কয়েক দশ থেকে কয়েকশ গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই তাপপ্রবাহে দিনের সর্বোচ্চ এবং রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা অতীতের তুলনায় গড়ে ২ থেকে ৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি হয়েছে। অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস শুধু তাপপ্রবাহের সম্ভাবনাই বাড়ায়নি, এর তীব্রতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। তাপপ্রবাহের প্রভাব ইতোমধ্যেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্পষ্ট। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত তাপজনিত কারণে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন প্রবীণ ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানুষ। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর বেড়েছে চাপ। বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তীব্র গরমের কারণে কোথাও কোথাও স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে, সাধারণ মানুষকে বারবার সতর্কবার্তা জারি করেছে প্রশাসন। সতর্কতার বিষয়, বিশ্বের গড় তাপমাত্রার তুলনায় ইউরোপ দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের চরম তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে, যদি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন দ্রুত কমানো না যায়। ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, তেমনি বিশ্ব উষ্ণায়নের মূল কারণ, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর নির্গমন দ্রুত কমানোও জরুরি।
সূত্র: World Weather Attribution report, “Fossil fuel emissions have rapidly worsened European heatwaves in just a few decades” (June 2026).
