উপগ্রহ- চিত্রে নেপালের বন্যার পূর্ব-সংকেত 

উপগ্রহ- চিত্রে নেপালের বন্যার পূর্ব-সংকেত 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গত ২৬শে আগস্ট নেপাল–তিব্বত সীমান্তের কাছে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বরফ ও পাথরের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে। এর ফলে যে প্রবল আকস্মিক বন্যা হয়, তাতে সহস্রাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, এবং চার হাজারের বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ। নতুন বিশ্লেষণ বলছে, বিপর্যয়ের কয়েক দিন আগেই উপগ্রহ-চিত্রে পাহাড়ের অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেখা গিয়েছিল।

ভার্জিনিয়া টেকের ভূ-পদার্থবিদ মানুচেহর শিরজাই ও তাঁর সহকর্মীরা ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সেন্টিনেল-১ উপগ্রহের রেডার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। ৮ জানুয়ারি থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে শেষ পর্যবেক্ষণটি ছিল বিপর্যয়ের মাত্র সাত দিন আগের। সেখানে দেখা যায়, ধসের সম্ভাব্য এলাকার হিমবাহ ও তার নীচের পাথুরে অংশ ধীরে ধীরে ঢালের দিকে এগোচ্ছে। এর মাসিক গতি ছিল প্রায় ১০ মিলিমিটার।

শুধু গতিই অস্বাভাবিক নয়। অনেক হিমবাহই নিয়মিতভাবে ধীর গতিতে সরে যায়। কিন্তু গবেষণায় আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ধরা পড়ে। বরফ ও পাথরের চলাচলের গতি ধীরে ধীরে বাড়ছিল। অর্থাৎ পাহাড়ের বিকৃতি বা নড়াচড়ার হার পরিবর্তিত হচ্ছিল। এই ধরনের ত্বরণকে একটি অস্থিতিশীল ভূ-ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সতর্কসংকেত মনে করা যেতে পারে।

তবে এই সংকেত দেখে তখনই ধ্স আসন্ন বলে নিশ্চিতভাবে সতর্কতা জারি করা সম্ভব ছিল না। গবেষকদের মতে, এমন তথ্যর ভিত্তিতে এলাকাটিকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা যেত। গবেষণার ফলাফলকে এখনও প্রাথমিক এবং ধসের পরের ছবির সঙ্গে তুলনা করে যাচাই করা হচ্ছে।

বর্তমানের অধিকাংশ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা মূলত হিমবাহ-হ্রদের আকস্মিক জলমুক্তির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু হিমবাহ ও পাহাড়ি পাথরের সরাসরি ধস শনাক্ত করার ব্যবস্থা এখনও সীমিত। দুর্গম উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল, স্থলভিত্তিক পর্যবেক্ষণের অভাব এবং নেপাল–তিব্বত সীমান্তের মতো আন্তর্জাতিক সীমানা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

গবেষকদের প্রস্তাবিত ভবিষ্যৎ সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রথমে উপগ্রহভিত্তিক রেডার দিয়ে বিশাল পাহাড়ি অঞ্চল নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় অ্যালগরিদম অস্বাভাবিক গতিবিধি বা ত্বরণ শনাক্ত করবে। সন্দেহজনক এলাকা চিহ্নিত হলে উচ্চ-রেজোলিউশনের উপগ্রহ, ক্যামেরা ও ভূ-কম্পন সেন্সরের মাধ্যমে আরও নিবিড় নজরদারি চালানো হবে।

শুধু ধ্সের সম্ভাবনা শনাক্ত করলেই হবে না,ধ্স হলে তার পরিণতি কী হতে পারে, সেটিও হিসাব করতে হবে। পাহাড় ধসে নদী আটকে গিয়ে সাময়িক হ্রদ তৈরি করতে পারে, যা পরে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় উপগ্রহ-নির্ভর বিকৃতিকে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি ভূখণ্ডের মডেল, নদী অবরোধ, বন্যা ও তুষারধসের ঝুঁকির বিশ্লেষণও জরুরি। পাহাড়ি দুর্যোগকে আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে নয়, বরং একটি বিপজ্জনক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে পর্যবেক্ষণ করাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

 

সূত্র: https://www.nature.com/articles/d41586-026-02746-4

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × 1 =