এক ইলেকট্রনে ঘায়েল সিলিকন চিপ  

এক ইলেকট্রনে ঘায়েল সিলিকন চিপ  

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

আধুনিক পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রযুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে সিলিকন চিপ। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, তথ্য-প্রযুক্তি কেন্দ্র, গাড়ি, চিকিৎসা যন্ত্র থেকে শুরু করে মহাকাশ প্রযুক্তি পর্যন্ত। বেশ কিছুকাল ধরে বিজ্ঞানীরা দেখছিলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব চিপের কর্মক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যায়। কেন এমন হয়, তার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা এতদিন পরিষ্কার ছিল না। এবার সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছে। এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন অধ্যাপক ক্রিস ভ্যান ডে ওয়াল এবং তাঁর গবেষক দল। তাঁদের গবেষণার সম্পূর্ণ বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে ফিজিক্যাল রিভিউ- বি জার্নালে। গবেষণাটি মূলত “হট-ক্যারিয়ার ডিগ্রেডেশন’’ নামে পরিচিত একটি সমস্যার ব্যাখ্যা দেয়। সাধারণভাবে, ট্রানজিস্টরের ভেতর দিয়ে চলাচল করা কিছু ইলেকট্রন অতিরিক্ত শক্তি অর্জন করলে তাদের “হট ইলেকট্রন’’ বলা হয়। এতদিন ধারণা ছিল, বহু ইলেকট্রনের ধারাবাহিক আঘাতেই বোধহয় ধীরে ধীরে চিপের ক্ষতি হয়। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, বাস্তবে একটি মাত্র উচ্চশক্তির ইলেকট্রনই এই ক্ষয় ঘটায় ।

গবেষকেরা উন্নত কোয়ান্টাম সিমুলেশন ব্যবহার করে দেখেছেন, যখন একটি শক্তিশালী ইলেকট্রন চিপের ভেতরে অজ্ঞাত এক বিশেষ ইলেকট্রনিক দশায় সাময়িকভাবে প্রবেশ করে, তখন এটি সিলিকন ও হাইড্রোজেনের মধ্যকার বন্ধন দুর্বল করে দেয়। সাধারণত হাইড্রোজেন পরমাণুই চিপের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি ঢেকে রেখে কাঠামোকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু বন্ধন একবার দুর্বল হয়ে গেলে হাইড্রোজেন সরে যায়, এবং নীচে লুকিয়ে থাকা ত্রুটিপূর্ণ সিলিকন বন্ধন উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে এর ফলেই ট্রানজিস্টরের গতি কমে যায়, শক্তি অপচয় বাড়ে এবং চিপের আয়ু কমে।

গবেষণার আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, এখানে হাইড্রোজেনকে সাধারণ কণার মতো নয়, বরং কোয়ান্টাম তরঙ্গধর্মী সত্তা হিসেবে দেখা গেছে। অর্থাৎ হাইড্রোজেন নির্দিষ্ট স্থানে স্থিরভাবে থাকে না; তরঙ্গধর্মী আচরণ করে। তাই বন্ধন ভাঙার ঘটনাটি শুধু তাপের কারণে নয়, সম্ভাব্যতাভিত্তিক কোয়ান্টাম প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

এই মডেলটি আরও কয়েকটি পুরনো রহস্যের সমাধান করেছে। যেমন, কেন প্রায় ৭ ইলেকট্রন-ভোল্ট শক্তিতে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়, কেন এই প্রক্রিয়া তাপমাত্রার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয়, এবং কেন হাইড্রোজেনের বদলে ভারী জল/ ডিউটেরিয়াম আইসোটোপ ব্যবহার করলে ক্ষয় অনেক ধীরে ঘটে।

গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতের আরও টেকসই অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি তৈরিতে বড় ভূমিকা পালন করবে। শুধু কম্পিউটার চিপ নয়, LED, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং শিল্পযন্ত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোয়ান্টাম স্তরের এই অনুধাবন ভবিষ্যতের ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিকে আরও নির্ভরযোগ্য ও দীর্ঘস্থায়ী করতে সহায়তা করবে।

 

সূত্র: Shelly Leachman (University of California, Santa Barbara), Physical Review B (2026).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − seven =