ওজন কমানোর প্রাকৃতিক ওষুধ আবিষ্কার 

ওজন কমানোর প্রাকৃতিক ওষুধ আবিষ্কার 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৮ আগষ্ট, ২০২৬

সম্প্রতি বেশ কিছু বছর ধরে স্থূলতার চিকিৎসায় ওজেম্পিক ও ওয়েগোভির মতো ওষুধ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। তবে তার সঙ্গে বমিভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য, হজমের সমস্যা এবং পেশি ক্ষয় প্রভৃতি একাধিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে একটি প্রাকৃতিক অণু শনাক্ত করেছেন। প্রাণীর ওপর পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটিও ওজেম্পিকের মতো ক্ষুধা কমিয়ে ওজন কমাতে সক্ষম। কিন্তু পরিচিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলোর বেশিরভাগই দেখা যায়নি। গবেষণার বিবরণ নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

এই নতুন অণুটির নাম BRP (BRINP2-related peptide)। এটি শরীরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হওয়া একটি ক্ষুদ্র পেপটাইড। এটি কাজ করে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশে। এই হাইপোথ্যালামাস ক্ষুধা, বিপাকক্রিয়া, শরীরের তাপমাত্রা, হরমোনের কার্যক্রম এবং শক্তি ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। ওজেম্পিকের সক্রিয় উপাদান ল সেমাগ্লুটাইড। মস্তিষ্ক, অন্ত্র, অগ্ন্যাশয়সহ বিভিন্ন অঙ্গে কাজ করায় এর প্রভাবও বিস্তৃত হয়। বিপরীতে BRP মূলত হাইপোথ্যালামাসে কাজ করায় এটি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে আরও নির্দিষ্ট ও লক্ষ্যভিত্তিক ভূমিকা পালন করে।

এই অনবদ্য আবিষ্কারের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। গবেষকেরা পেপ্টাইড প্রেডিক্টার নামক একটি এআই অ্যালগরিদম তৈরি করেন, যা মানুষের প্রায় ২০ হাজার প্রোটিন-কোডিং জিন বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য জৈব-সক্রিয় পেপটাইড খুঁজে বের করে। বিশাল তথ্যভান্ডার থেকে ধাপে ধাপে অনুসন্ধান চালিয়ে অ্যালগরিদমটি ৩৭৩টি সম্ভাব্য প্রোহরমোন শনাক্ত করে এবং সেখান থেকে ২,৬৮৩টি সম্ভাব্য পেপটাইডের তালিকা তৈরি করে। পরে গবেষকেরা পরীক্ষাগারে ১০০টি পেপটাইড পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে মাত্র ১২টি অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে গঠিত BRP সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং স্নায়ুকোষের কার্যকলাপও বাড়িয়ে দেয়।

এরপর গবেষকেরা BRP-এর কার্যকারিতা ইঁদুর ও গিনিপিগের ওপর পরীক্ষা করেন। খাবার খাওয়ার আগে একটি ইনজেকশন দেওয়ার পর উভয় প্রাণীর খাদ্যগ্রহণ এক ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। স্থূল ইঁদুরকে টানা ১৪ দিন BRP দেওয়ার পর দেখা যায়, তারা গড়ে প্রায় ৩ গ্রাম ওজন কমেছে এবং এই ওজনের প্রায় পুরোটাই ছিল শরীরের চর্বি। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণ দলের ইঁদুর একই সময়ে প্রায় ৩ গ্রাম ওজন বাড়িয়েছে। পাশাপাশি BRP গ্রহণকারী প্রাণীদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতাও উন্নত হয়েছে।

আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, পরীক্ষায় BRP ব্যবহারের পর প্রাণীদের মধ্যে বমিভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য, চলাফেরার পরিবর্তন, অতিরিক্ত জল পান, উদ্বেগজনিত আচরণ কিংবা উল্লেখযোগ্য পেশি ক্ষয়ের মতো সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, BRP এমন একটি ভিন্ন স্নায়বিক ও বিপাকীয় পথ ব্যবহার করে কাজ করে, যেটা GLP-1 বা সেমাগ্লুটাইডের পথ থেকে আলাদা। তাই এটি ভবিষ্যতে আরও নিরাপদ ও কার্যকর স্থূলতা-নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ তৈরির ভিত্তি হতে পারে।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত সব ফলাফলই মানুষ ব্যতীত অন্য প্রাণীর ওপর পরীক্ষার ভিত্তিতে পাওয়া গেছে। মানুষের ক্ষেত্রে BRP কতটা নিরাপদ, কার্যকর এবং দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নিশ্চিত করতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অপরিহার্য। বর্তমানে গবেষকেরা BRP ঠিক কোন কোষীয় রিসেপ্টরের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং কীভাবে এর কার্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ী করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছেন। যদি মানবদেহেও একই ধরনের ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়, তাহলে এটি স্থূলতা চিকিৎসায় কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসম্পন্ন নতুন প্রজন্মের ওষুধ হিসেবে অন্যতম মুশকিলআসান হবে।

 

সূত্রঃ Prohormone cleavage prediction uncovers a non-incretin anti-obesity peptide by Laetitia Coassolo, Niels B. Danneskiold-Samsøe,et.al; published in Nature, 2025; 641 (8061): 192 DOI: 10.1038/s41586-025-08683-y

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × 2 =