দক্ষিণ মেরুর বরফে ঢাকা এক প্রত্যন্ত দ্বীপের উপরে যেন ভেসে উঠেছে মানুষের একটি বিশাল খুলি! উপর থেকে দেখলে মনে হয়, চোখের কোটর ও দাঁত বের করা মুখ নিয়ে কেউ বুঝি তাকিয়ে রয়েছে দূরের দিকে। নাসার উপগ্রহের তোলা ছবিতে ধরা পড়েছে এমনই এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক দৃশ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহের বাহ্যিক গঠনে দ্রুত পরিবর্তনই এই রহস্যময় আকৃতির আসল কারণ।
ওয়েডেল সাগরে, অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের পূর্ব দিকে অবস্থিত ভেগা দ্বীপের বরফ ও পাথরের প্রাকৃতিক গঠন থেকেই তৈরি হয়েছে এই খুলির মতো অবয়ব। নাসার ল্যান্ডস্যাট-৯ উপগ্রহ থেকে ওএলআই (অপারেশনাল ল্যান্ড ইমেজার) যন্ত্রের সাহায্যে ২০২৫ সালের ২২ মার্চ এবং ২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর দ্বীপটির ছবি তোলা হয়। দুটি ছবির তুলনা করে বিজ্ঞানীরা দ্বীপটির বরফের আস্তরণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করেছেন।
খুলির মতো দেখতে এই অবয়বের প্রতিটি অংশই আসলে ভূপ্রকৃতি। বরফের উপর মাথা তুলে থাকা পাথুরে চূড়া বা ‘নুনাটাক’ দেখতে চোখের কোটরের মতো। হিমবাহের পাশে জমে থাকা পাথর ও মাটির স্তূপ, অর্থাৎ ‘ল্যাটারাল মোরেন’, তৈরি করেছে মুখের রেখা। আর ডেভিলস বে হিমবাহকে মনে হচ্ছে খুলির নীচের চোয়াল।
২০২৫ সালের মার্চে দ্বীপটির অধিকাংশ অঞ্চল তরতাজা বরফে ঢাকা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবরে বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে তাজা তুষার সরে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে গাঢ় রঙের হিমবাহের বরফ। নিকোলস কলেজের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ মাউরি পেল্টো-র মতে, ২০২৬ সালের শীতকালে, বিশেষত জুন মাসে, অস্বাভাবিক উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে এমনটা ঘটেছে। শীতকালে নতুন তুষারপাতও ছিল তুলনায় কম। পাশাপাশি বরফের সরাসরি বাষ্পীভবন (সাবলিমেশন/ ঊর্ধ্বপাতন) এবং প্রবল বাতাসে তুষার উড়ে যাওয়ার ফলেও বরফের উপরিভাগ উন্মুক্ত হয়েছে।
এই পরিবর্তন হিমবাহের জন্য বিপজ্জনক। কারণ, সতেজ সাদা তুষার সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। কিন্তু গাঢ় রঙের উন্মুক্ত বরফ বেশি তাপ শোষণ করে। ফলে অ্যান্টার্কটিকায় দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বরফ দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে গলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বসন্তে সামান্য নতুন তুষারপাত হলেও সাময়িকভাবে এই প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর হতে পারে।
ভেগা দ্বীপের হিমবাহের সংকোচন অবশ্য নতুন ঘটনা নয়। ১৯৮২ সালের একটি গবেষণায় দ্বীপটিতে মোট ২৯টি হিমবাহের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৯৮-৯৯ সাল থেকে ডেভিলস বে হিমবাহের উপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের পরিমাপ থেকে দেখা গেছে, হিমবাহটির মোট বরফের পরিমাণ ক্রমশ কমেছে। অন্যান্য হিমবাহেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এই দ্বীপটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অ্যান্টার্কটিকা অভিযানের এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। ১৯০১-০৩ সালের সুইডিশ অ্যান্টার্কটিক অভিযানের সময় বরফের চাপে এখানে গবেষকদের জাহাজ ধ্বংস হয়ে যায় এবং অভিযাত্রীরা তিনটি দলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। দীর্ঘ প্রতিকূলতার পর ১৯০৩ সালের বসন্তে দুটি দল ভেগা দ্বীপের কাছে ‘কেপ ওয়েল-মেট’ নামক স্থানে পুনর্মিলিত হয়। পরে আর্জেন্টিনার একটি অভিযান দল তাঁদের উদ্ধার করে।
আজ সেই দ্বীপের খুলির মতো অদ্ভুত অবয়ব শুধু প্রকৃতির বিস্ময় নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের একটা সতর্কবার্তাও বটে। তুষার ও বরফের আবরণ সরে গেলে বদলে যেতে পারে তার চোয়াল, চোখের কোটর এবং গোটা চেহারা। অর্থাৎ, বরফের এই রহস্যময় খুলি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে উষ্ণায়নের প্রভাবে।
সূত্রঃ NASA reveals a haunting skull hidden in Antarctica’s ice,November 2, 2026, NASA Earth Observatory.
