মহাবিশ্ব নিয়ে গবেষণার জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্রুত বড় পরিবর্তন আনছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে এখন বিজ্ঞানীরা শুধু নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা ব্ল্যাক হোল নিয়েই আলোচনার মেতে থাকছেন না। তাঁদের আলোচনার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কৃ বু। কেন্দ্রটির অ্যাস্ট্রো এআই (AstroAI) প্রকল্পের প্রধান সিসিলিয়া গারাফোর নেতৃত্বে গবেষকেরা মেশিন লার্নিং ব্যবহার করছেন বিভিন্ন জটিল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধানে। শুরুতে তাঁদের লক্ষ্য ছিল গণনা ও তথ্য বিশ্লেষণের কাজ সহজ করা। কিন্তু বড় ভাষাভিত্তিক মডেল (এলএলএম), যেমন চ্যাটজিপিটি বা ক্লড, গবেষণার গতিপথই বদলে দিতে শুরু করেছে।
এমনই এক উদাহরণ দিয়েছেন গবেষক অ্যালিসা গুডম্যান। বহু বছর ধরে তাঁর দল একটি দূরবর্তী গ্যালাক্সির সর্পিল বাহুগুলোর গতিবিধি বিশ্লেষণের সমস্যায় আটকে ছিল। তিনি চ্যাটজিপিটির সাহায্য নেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমস্যার সমাধান পান। এখন সেই তথ্যের ভিত্তিতে নতুন গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। শুধু তথ্য বিশ্লেষণ নয়, এআই এখন গবেষণাপত্র খোঁজা, কোড লেখা, টেলিস্কোপ ব্যবহারের প্রস্তাব তৈরি করা, এমনকি নতুন বৈজ্ঞানিক ধারণা তৈরির কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু গবেষকের মতে, অদূর ভবিষ্যতে এআই দক্ষ পোস্টডক গবেষকের সমমানের কাজ করতে পারবে।
তবে এই অগ্রগতি বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগও তৈরি করেছে। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতিঃপদার্থবিদ ডেভিড হগ মনে করেন, গবেষণার সব ক্ষেত্র যদি কৃ বুর হাতে চলে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে জ্যোতির্বিজ্ঞান মানুষের কর্মকাণ্ড হিসেবে আদৌ টিকে থাকবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। এই উদ্বেগের একটি বড় কারণ, ‘ডিস্কিলিং’ বা দক্ষতা হারানোর আশঙ্কা। গবেষণার যেসব কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজ করতে করতে ছাত্ররা শেখে, কৃ বু যদি সেগুলো করে দেয়, তাহলে ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ হারাবে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মিনাস কারামানিসের মতে, বিভ্রান্তি, ব্যর্থতা ও দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যার সঙ্গে লড়াই করার মধ্য দিয়েই মৌলিক বৈজ্ঞানিক চিন্তাশক্তি গড়ে ওঠে। কৃ বু যদি সেই প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করে দেয়, তাহলে নতুন প্রজন্মের গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হবে। আরেকটি সমস্যা হল গবেষণাপত্রের বন্যা। কৃ বুর সাহায্যে দ্রুত গবেষণাপত্র তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় বিভিন্ন জার্নালে জমা পড়া নিবন্ধের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে মানসম্মত গবেষণা চিহ্নিত করা এবং পর্যালোচক খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। তবে সবাই সমানভাবে হতাশ নন। সিসিলিয়া গারাফোর মতে, বিজ্ঞানের মূল লক্ষ্য সত্যের সন্ধান। যদি নতুন প্রযুক্তি সেই সত্যের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে সাহায্য করে, তাহলে তা ব্যবহার করা উচিত। তাঁর মতে, শুধুমাত্র মানুষকে আবিষ্কারের আনন্দ দেওয়ার জন্য সত্যকে আড়াল করে রাখা অর্থহীন।
অন্যদিকে অ্যাস্ট্রো এআই-এর উপপরিচালক রাফায়েল মার্তিনেজ-গালারসা মনে করেন, বিজ্ঞান তো কেবল কিছু ফলাফল নয়, তা একটি মানবিক ও সামাজিক প্রক্রিয়াও। একটি সমস্যার সমাধান মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কয়েক মাস ধরে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ কয়েক মিনিটে কৃ বু থেকে উত্তর পাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। তাঁর কথায়, “মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করা মানুষের অভিজ্ঞতারই অংশ। যদি সেই অভিজ্ঞতা হারিয়ে যায়, তাহলে দ্রুত উত্তর পাওয়ার মধ্যে আসল লাভ কোথায়?” কৃ বু তাই জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও বিপত্তি। এটি গবেষণাকে দ্রুততর করছে, কিন্তু সেই সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চার মানবিক অর্থ ও ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলছে।
সূত্র: Science; June ; 2026
