কোষের ভেতর ডিএনএ কীভাবে ভাঁজ খায়? 

কোষের ভেতর ডিএনএ কীভাবে ভাঁজ খায়? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মানবদেহের প্রতিটি কোষের ডিএনএ-কে যদি পুরোটা টেনে বের করা হয়, তার দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে প্রায় ২ মিটার। অথচ এই বিশাল ডিএনএ একটি ক্ষুদ্র কোষের কেন্দ্রক/ নিউক্লিয়াসের মধ্যে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে গুটিয়ে থাকে। শুধু কি জায়গা বাঁচানোর জন্যই এমন কৌশল? আসল বিষয়টা হল, ডিএনএ কতটা শক্তভাবে বা আলগাভাবে কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়েছে, তারই ওপর নির্ভর করে কোন জিন সক্রিয় হবে আর কোনটি নিষ্ক্রিয় থাকবে। এই প্রথম বিজ্ঞানীরা জীবন্ত কোষের ভেতরে ডিএনএ-র এই ভাঁজ, বিন্যাস ও চলাচল আগের তুলনায় অনেক সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণের নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে পেরেছেন।

বার্সেলোনার সেন্টার ফর জিনোমিক রেগুলেশন (CRG), সিটি ইউনিভার্সিটি অফ হং কং এবং গুয়াংডং প্রভিন্সিয়াল পিপলস হসপিটাল -এর গবেষকেরা এক বিশেষ ধরনের প্রভাযুক্ত রঞ্জক বা ফ্লুরোফোর তৈরি করেছেন। এগুলোর নাম HoTs। এই অণুগুলো জীবন্ত কোষের মধ্যে প্রবেশ করে ডিএনএ-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটানা আলো না ছড়িয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর জ্বলে ও নেভে। এই ঝলকানির বৈশিষ্ট্যই গবেষকদের পৃথক পৃথক রঞ্জক অণুর অবস্থান নির্ণয় করতে সাহায্য করে।

STORM নামের সুপার-রেজোলিউশন মাইক্রোস্কোপি প্রযুক্তির সঙ্গে HoTs ব্যবহার করে জীবন্ত কোষের ডিএনএ-কে প্রায় ২০ ন্যানোমিটার রেজোলিউশনে দেখা সম্ভব হয়েছে। প্রচলিত মাইক্রোস্কোপে প্রায় ২০০ ন্যানোমিটারের চেয়ে কাছাকাছি থাকা বস্তু আলাদা করে দেখা কঠিন। উন্নততর MINFLUX প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাসায়নিকভাবে সংরক্ষিত কোষে পৃথক রঞ্জক অণুর অবস্থান প্রায় ৩ ন্যানোমিটার নির্ভুলতায় নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। ডিএনএ-র দুটি তন্ত্রীর ব্যাস প্রায় ২ ন্যানোমিটার। অর্থাৎ এই প্রযুক্তি ডিএনএ অণুর প্রকৃত আকারের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফল এসেছে ক্যানসার আক্রান্ত অন্ত্রের টিস্যু পর্যবেক্ষণ করে। তিনজন ক্যানসার রোগীর সংরক্ষিত টিস্যুতে দেখা যায়, সুস্থ কোষের তুলনায় ক্যানসার কোষে ডিএনএ অনেক বেশি আলগা ও ছড়ানো অবস্থায় রয়েছে। আগের গবেষণাতেও দেখা গেছে, কোষে ক্যানসারের আগ্রাসনের সঙ্গে সঙ্গে ডিএনএ-এর দ্বিতন্ত্র ধীরে ধীরে অনেকটা আলগা হয়। ফলে ভবিষ্যতে কোনো টিউমার কতটা আক্রমণাত্মক, তা বোঝার ক্ষেত্রে অন্যতম সূচক হবে ডিএনএ-র ভাঁজের মাত্রা।

গবেষকেরা AINU নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাও ব্যবহার করেছেন। নতুন ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে AINU ডিএনএ-র ভাঁজের মাত্রা একই থাকা সত্ত্বেও ত্বকের কোষ ও স্টেম সেলকে ৯৬–৯৮ শতাংশ নির্ভুলতায় আলাদা করতে পেরেছে। কারণ, ভিন্ন ধরনের কোষে ডিএনএ ভিন্ন ভিন্নভাবে কুণ্ডলীকৃত অবস্থায় থাকে।

তবে এ পদ্ধতিটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। HoTs নির্দিষ্ট কোনো জিনকে চিহ্নিত করে না এবং সর্বোচ্চ রেজোলিউশনের ছবি এখনো সংরক্ষিত কোষেই পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে জীবন্ত কোষে MINFLUX ব্যবহার করে আরও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা চলছে। সফল হলে এই প্রযুক্তি ক্যানসার নির্ণয়, স্টেম সেল নির্বাচন এবং কোষের জিন নিয়ন্ত্রণ বোঝার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখবে আশা করা যায়।

সূত্র: “HoT auto-blinking probes enable real-time, super-resolution chromatin imaging in live cells and tissues” by Aiping Wang, Shanshan Liu, Heng Shi, 28th August 2026, published in Molecular Cell.

DOI: 10.1016/j.molcel.2026.08.010

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − twelve =