আজ আমরা জানি, উদ্ভিদ, প্রাণী কিংবা মানুষের দেহ—সবই অসংখ্য ক্ষুদ্র কোষ (cell) দিয়ে গঠিত। কিন্তু এই ‘কোষ’ নামটি এল কোথা থেকে? এর উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি সময় আগে। সপ্তদশ শতাব্দীতে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের উন্নয়নের ফলে বিজ্ঞানীরা প্রথমবার ক্ষুদ্র জগতকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। সেই সময়ের অন্যতম প্রতিভাবান বিজ্ঞানী ছিলেন রবার্ট হুক। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্ট চার্চ-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানেই নিজের তৈরি অণুবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতেন। ১৬৬৫ সালে রবার্ট হুক তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ মাইক্রোগ্রাফিয়া (Micrographia) প্রকাশ করেন। এটি কোন সাধারণ বই ছিল না, ক্ষুদ্র জগত সম্পর্কে মানুষের ধারণায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল এই মাইক্রোগ্রাফিয়া। অপটিক্স ও অণুবীক্ষণ যন্ত্রের ব্যবহারের উপর রচিত প্রথম দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ হিসেবে মাইক্রোগ্রাফিয়া বিজ্ঞানের ইতিহাসে বিশেষ স্থানের অধিকারী। নিজের তৈরি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে হুক এমন সব ক্ষুদ্র বস্তু পর্যবেক্ষণ করেন, যা আগে মানুষের চোখে কখনও ধরা পড়েনি। বইটিতে তিনি পোকামাকড়, উদ্ভিদ, ছত্রাকসহ অসংখ্য ক্ষুদ্র জীব ও বস্তুর অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বাস্তবসম্মত চিত্র অঙ্কন করেন। শিল্পকলায় তাঁর দক্ষতার কারণে এসব চিত্র শুধু বৈজ্ঞানিক দলিলই নয়, একই সঙ্গে শিল্পকর্মেরও অনন্য উদাহরণ। বিজ্ঞান ও শিল্পের এই অসাধারণ সমন্বয় বইটিকে তৎকালীন ইউরোপে বিপুল জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এই গবেষণার সময়ই ঘটে জীববিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটি বোতলের কর্ক-এর পাতলা অংশ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে হুক দেখতে পান, সেটি অসংখ্য ছোট ছোট ফাঁপা খোপে বা প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। প্রকোষ্ঠগুলির আকৃতি ঠিক যেন মধ্যযুগীয় ইউরোপের মঠে সন্ন্যাসীদের থাকবার ছোট ছোট কক্ষর মতো। ইংরেজিতে সেই কক্ষগুলিকে বলা হতো Cell। সেই মিল থেকেই তিনি এই ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠগুলির নাম দেন Cell, তারই বাংলা হল কোষ।
যদিও হুক প্রকৃতপক্ষে মৃত উদ্ভিদকোষের কোষপ্রাচীর দেখেছিলেন, তবুও তাঁর দেওয়া এই নামই পরবর্তীকালে জীববিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক পরিভাষায় পরিণত হয়। আজ জীবের গঠনগত ও কার্যগত মৌলিক একককে আমরা কোষ (Cell) নামেই চিনি। অন্যদিকে মাইক্রোগ্রাফিয়া শুধু কোষের নামকরণের জন্যই বিখ্যাত নয়। এই বইতে রবার্ট হুক জীবাশ্মের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন এবং সেগুলির সঙ্গে পাললিক শিলাস্তরের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেন। পাশাপাশি তিনি চাঁদের পৃষ্ঠের গহ্বর (ক্রেটার) এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানা বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেন। ফলে একটি বই-ই একই সঙ্গে জীববিজ্ঞান, ভূ-বিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ আখর হয়ে ওঠে। প্রকাশের পরই মাইক্রোগ্রাফিয়া দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং রয়্যাল সোসাইটির প্রকাশিত প্রথম ‘বেস্টসেলার’ গ্রন্থে পরিণত হয়। বিখ্যাত লেখক স্যামুয়েল পেপিস তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, বইটি হাতে পাওয়ার পর তিনি সারা রাত জেগে এটি পড়েছিলেন। তৎকালীন বৈজ্ঞানিক সমাজে মাইক্রোগ্রাফিয়া-র জনপ্রিয়তা ছিল আজকের যুগে স্টিফেন হকিংয়ের এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম গ্রন্থের জনপ্রিয়তার সঙ্গে তুলনীয়। পরবর্তী কয়েক শতকে হুকের সেই আবিষ্কারকে ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে কোষতত্ত্ব। আজ আধুনিক জীববিজ্ঞান, জিনতত্ত্ব, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং জৈবপ্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে উঠেছে কোষ সম্পর্কে এই ধারণার ওপর। একটি সাধারণ কর্কের টুকরোকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখার মধ্য দিয়েই শুরু হয়েছিল সেই বৈজ্ঞানিক বিপ্লব। রবার্ট হুক হয়তো জানতেন না, তাঁর দেওয়া ‘Cell’ নামটিই একদিন জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক শব্দগুলির একটি হয়ে উঠবে। কিন্তু তাই হয়েছিল। তাঁর সেই পর্যবেক্ষণই মানবসভ্যতার বৈজ্ঞানিক জ্ঞানভাণ্ডারে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।
সূত্র: Oxford Lifelong Learning
