ক্ষমার ইতিবাচক মনস্তত্ত্ব

ক্ষমার ইতিবাচক মনস্তত্ত্ব

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১ জুন, ২০২৬

কথায় আছে “ক্ষমা বলমশক্তানাং শক্তানাং ভূষণং ক্ষমা।

ক্ষমা বশীকৃতে লোকে ক্ষমায়াঃ কিম ন সিধ্যতি॥”

অর্থাৎ, রাগ বা প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে ক্ষমা করা দুর্বলদের আচরণ নয়, বরং এটি শক্তিশালী ও মহান ব্যক্তিদের পরম গুণ। ক্ষমা দ্বারা কঠিন শত্রুকেও বশীভূত করা বা জয় করা সম্ভব। আমরা অহরহই কথায় কথায় বলে থাকি, যাও, আমি তোমায় ক্ষমা করে দিলাম। এখন প্রশ্ন, এই ক্ষমা শব্দটির মধ্য দিয়ে আসলে আমরা আমাদের কোন বোধটা ব্যক্ত করতে চাই ? ক্ষমা কি কোনো সহজাত মানসিক প্রতিক্রিয়া? নাকি ক্ষমা কোনো সচেতন সিদ্ধান্ত?

সাম্প্রতিক এক স্নায়ুবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বলছেন, ক্ষমা বলতে সাধারণত আমরা যেটা বোঝাতে চাই সেটা অনেকটা এরকম – কেউ আমার ক্ষতি বা আমার সাথে অন্যায় করলে, তার প্রতি মনের রাগ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করা। এই আচরণের মানে কিন্তু অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া বা ভুলে যাওয়া নয়। এ হল একপ্রকার নিজের মানসিক শান্তি বজায় রাখার জন্য একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। মানুষ যখন কাউকে ক্ষমা করে, তখন সে কোনো স্মৃতি মুছে দেয় না; কেবল সেই স্মৃতির আবেগগত রং বদলে দেয়। অর্থাৎ, ঘটনাটি মনে থাকে, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তীব্র রাগ, ঘৃণা বা যন্ত্রণা ধীরে ধীরে কমে যায়। মানুষের মস্তিষ্ক যেন পুরোনো স্মৃতির ওপর নতুন এক ব্যাখ্যা ও অনুভূতির আস্তরণ তৈরি করে।

এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তারা ফাংশনাল এমআরআই (fMRI) প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবকদের কিছু অস্বস্তিকর ও বিরক্তিকর ছবি দেখানো হয়। অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছিল, এই ছবিগুলো অন্য একজন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের জন্য বেছে নিয়েছে।

পরে গবেষকেরা জানান, যিনি ছবিগুলো নির্বাচন করেছিলেন, তিনি একটি যুক্তিসংগত কারণ দেখিয়েছেন এবং নিজের কাজের জন্য অনুশোচনাও প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে আরেকজন ব্যক্তি কোনো দুঃখপ্রকাশ করেননি বা অনুতপ্ত ছিলেন না। এরপর অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় প্রথম ব্যক্তিকে ক্ষমা করতে, কিন্তু দ্বিতীয় ব্যক্তিকে নয়।

পরদিন যখন আবার একই ছবিগুলো দেখানো হয়, তখন দেখা যায় ক্ষমা করা ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ছবিগুলো অংশগ্রহণকারীদের কাছে অনেক কম কষ্টদায়ক মনে হচ্ছে। অথচ যে ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয়নি, তার সঙ্গে সম্পর্কিত ছবিগুলো আগের মতোই নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি করছিল।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কারণ মানুষের আবেগ কেবল ঘটনার ওপর নির্ভর করে না; বরং ঘটনাটিকে আমরা কী অর্থ দিচ্ছি, তার ওপরও নির্ভর করে। কেউ যদি আমাদের আঘাত দেয় এবং আমরা তাকে “নির্মম” বা “ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর” মানুষ হিসেবে দেখি, তাহলে স্মৃতিটি দীর্ঘদিন যন্ত্রণাদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু যখন আমরা তার অনুশোচনা, পরিস্থিতি বা মানবিক দুর্বলতাকে বুঝতে শুরু করি, তখন সেই স্মৃতির মানসিক ভারটা বদলে যেতে থাকে।

মস্তিষ্কের স্ক্যানে বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে দুটি অঞ্চলের সক্রিয়তা লক্ষ্য করেন। ডরসোমিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (DMPFC) এবং পস্টেরিয়র হিপোক্যাম্পাস— এই দুটি অঞ্চল এই পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত বলে গবেষকেরা দেখেছেন। প্রথম অংশটি অন্য মানুষের উদ্দেশ্য ও অনুভূতি বোঝার কাজে সাহায্য করে, আর দ্বিতীয় অংশটি স্মৃতি সংরক্ষণ করে। অর্থাৎ, ক্ষমা করার সময় মানুষ শুধু আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে না; সে আসলে নিজের স্মৃতিকে নতুনভাবে সম্পাদনা করে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এখানে একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য লুকিয়ে আছে। এই প্রক্রিয়াটি “মেমোরি রিকনসলিডেশন”-এর মতো। অর্থাৎ, কোনো পুরোনো স্মৃতি আবার মনে পড়লে মস্তিষ্ক সেটিকে স্থির অবস্থায় রাখে না; বরং নতুন তথ্য ও আবেগের সঙ্গে মিলিয়ে মিশিয়ে সেটিকে কিছুটা পরিবর্তন করে। মানুষ যখন কাউকে ক্ষমা করে, তখন সে অপরাধকে বৈধতা দেয় না; বরং নিজের ভেতরের মানসিক বন্দিত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। রাগ ও ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে বহন করলে মস্তিষ্ক বারবার সেই কষ্টের স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করে। তার ফলে একজন ব্যক্তি মানসিকভাবে ভেতরে ভেতর অতীতের চার দেওয়ালে আটকেই থেকে যায়। কিন্তু ক্ষমা এইখানেই একটি নতুন অর্থ বহন করে যে, আমি কষ্ট পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু সেই কষ্ট আমাকে সারাজীবন নিয়ন্ত্রণ করবে না।

এই গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী ফিলিপ দি ব্রিগার্ড এই প্রসঙ্গে বলেছেন, ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে মানুষ অন্যায়ের কথা ভুলে যায়। তবে , কাউকে ক্ষমা করলে সেই স্মৃতি আর আগের মতো তীক্ষ্ণ পীড়া দেয় না। বিষয়টা অনেকটা ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার মতোই। দাগ থেকে যায়, কিন্তু ব্যথা/যন্ত্রণার প্রকোপ যতদিন যায় আস্তে আস্তে কমে আসে।

যদিও এই গবেষণায় মাত্র ২৩ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন এবং পরীক্ষাটি বাস্তব জীবনের জটিল সম্পর্কের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত ল্যাবরেটরি পরিবেশে করা হয়েছে, তবু ফলাফলটি যথার্থই গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমা মানুষের মানসিক স্বস্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে গভীর ভূমিকা পালন পারে।

মোটকথা, ক্ষমা আসলে অতীতকে মুছে ফেলার বিষয় নয়। বা কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়। বরং এটি মানুষের মনের এক গভীর অভিযোজন ক্ষমতা। এ এমন এক মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে মানুষ নিজের কষ্টকে নতুন অর্থ দেয়, স্মৃতিকে নতুন আবেগে রাঙায়। বিষয়টা একেবারেই এরকম নয় যে আমি কাউকে ক্ষমা করলাম মানে একটা বাতিলের তালিকায় থাকা সম্পর্ক টিকে গেল। যে ক্ষমা করতে পারে, সেই অনুভূতি তার কাছে দিনের শেষে ধীরে ধীরে নিজেকেই নিজের কাছে মুক্ত করে। যে ক্ষমাপ্রার্থী তার থেকেও এ অনুভূতি বেশি জোরালো।

 

সূত্র: American Psychological Association journal Emotion (2026) — Songzhi Wu et al., “Forgiveness Updates Interpersonal Memories to Be Less Negative.”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 − nine =