একসময় মহাবিশ্বের ইতিহাসে অতি প্রকাণ্ড কৃষ্ণগহ্বরগুলি ছিল সবচেয়ে সক্রিয় ও শক্তিশালী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সত্তা। এগুলি ছিল ভয়ঙ্কর খাপুসে। গ্যাস, ধূলিকণা এমনকি সম্পূর্ণ নক্ষত্রের জন্মভূমি পর্যন্ত গ্রাস করে এরা নিজেদের আকার বাড়িয়েছে। সেই সময়ে তারা কোয়েসার হিসেবে তীব্র আলো বিকিরণ করত। কোয়েসার হল আপাত নাক্ষত্রিক উৎস। নক্ষত্রের মতো দেখতে হলেও এরা আসলে নক্ষত্রমণ্ডলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কোটি কোটি নক্ষত্রের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল। এদের আলো দৃশ্যমান মহাবিশ্বের একেবারে দূরতম প্রান্ত থেকেও দেখা যেত। এই বিশাল কৃষ্ণগহ্বরগুলির ভর সূর্যের চেয়ে বিলিয়ন গুণ বেশি হয়ে ওঠে এবং তারা ছায়াপথ গঠনের প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আন্দাজ, প্রায় ৭ বিলিয়ন বছর আগে থেকে এক অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হয়। এই ব্ল্যাক হোলগুলোর বৃদ্ধির হার ধীরে ধীরে কমে আসে। এমন পরিবর্তনের কারণ কী? ব্ল্যাক হোলের সংখ্যা কি কমে গেছে? নাকি তাদের ভর হ্রাস পেয়েছে? নাকি তাদের গোগ্রাসে গেলার দক্ষতা কমে গেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে সাম্প্রতিক এক বিস্তৃত গবেষণায় ১৩ লক্ষ ছায়াপথ এবং প্রায় ৮,০০০ সক্রিয় কৃষ্ণগহ্বরের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। চন্দ্র, এক্সএমএম-নিউটন এবং ইরোসিটা প্রভৃতি এক্স-রে মানমন্দির থেকে এগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে। এই বিশাল পরিসরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা একটি সুসংহত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন।
গবেষণার ফল বলছে, কৃষ্ণগহ্বরের সংখ্যা কমেনি, তাদের আকারও ছোট হয়নি। বরং মূল সমস্যাটি হলো খাদ্যাভাব। ব্ল্যাক হোলের বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ঠান্ডা গ্যাস। এই গ্যাস গিলে তারা শক্তি উৎপন্ন করে এবং বহরে বড় হয়। কিন্তু মহাবিশ্বে এই ঠান্ডা গ্যাসই ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।
মহাবিশ্বের ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যাকে মহাজাগতিক দ্বিপ্রহর ( “কসমিক নুন’’) বলা হয়। সে সময় তারকা গঠনের হার এবং কৃষ্ণগহ্বরের কার্যকলাপ সর্বোচ্চ মাত্রায় ছিল। সেই সময়ে প্রচুর ঠান্ডা গ্যাস লভ্য ছিল, যা কৃষ্ণগহ্বরকে দ্রুত বাড়তে সাহায্য করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই গ্যাসের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে আসে, ফলে ব্ল্যাক হোলগুলোর বৃদ্ধির হার ব্যাপকভাবে কমে যায়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ বিলিয়ন বছরে কৃষ্ণগহ্বরের বৃদ্ধির হার ২২ গুণ কমে গেছে। আজকের কৃষ্ণগহ্বরগুলো আগের মতো দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে না।
সুতরাং, বর্তমান মহাবিশ্বকে একটি পরিণত পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করাই যায়। বিশাল কৃষ্ণগহ্বরগুলো ইতিমধ্যেই তাদের সর্বোচ্চ আকারে পৌঁছে গেছে, আর তেমন বড় হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এখন তারা ধীরে ধীরে বৃদ্ধ হচ্ছে এবং একসময়ের অতিসক্রিয় ব্ল্যাক হোলগুলো ক্রমশ নিষ্ক্রিয়তার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সূত্র: Astronomy Space
