ভালো ঘুম যে শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা বহুদিন ধরেই জানা। তবে মস্তিষ্কের এমন একটি নির্দিষ্ট স্নায়ুপথও আছে, যা গভীর ঘুমের সময় বাড়বৃদ্ধির হরমোন নিঃসরণকেও নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে-র বিজ্ঞানীদের করা সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই স্নায়ুপথের কেন্দ্র রয়েছে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস অংশে। এখানে বিশেষ ধরনের স্নায়ুকোষ বাড়বৃদ্ধির GHRH হরমোন নিঃসরণ করে এবং একই সঙ্গে সোমাটোস্ট্যাটিন নামের আরেকটি হরমোনের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এই দুইয়ের ভারসাম্যের উপরই নির্ভর করে কখন এবং কতটা বাড়বৃদ্ধির হরমোন নিঃসৃত হবে। বাড়বৃদ্ধির হরমোনের সবচেয়ে বেশি নিঃসরণ হয় ঘুমের নন-র্যাপিড আই মুভমেন্ট (Non-REM) এবং র্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) পর্যায়ে। এই সময় শরীর পেশি ও হাড়ের গঠন মজবুত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যুর মেরামত করে এবং চর্বিকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে সাহায্য করে। তাই বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোর, ক্রীড়াবিদ কিংবা নিয়মিত শরীরচর্চা করা মানুষের জন্য ভালো ঘুম অত্যন্ত জরুরি। স্নায়ুপথের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্টেমে অবস্থিত লোকাস কোরুলিয়াস নামে একটি অংশেরও যোগাযোগ রয়েছে। গভীর ঘুমের সময় বাড়বৃদ্ধির হরমোনের মাত্রা বাড়তে থাকলে তা ধীরে ধীরে মস্তিষ্ককে জাগ্রত করে। ফলে ঘুম ভাঙার পর মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং চিন্তাশক্তি আরও উন্নত হতে পারে। এই ব্যবস্থায় একটি স্বাভাবিক ফিডব্যাক লুপ কাজ করে। আর সেটি নিশ্চিত করে যে বাড়বৃদ্ধির হরমোনের মাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে গিয়ে যেন ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। একই সঙ্গে শরীর যেন ঘুমের পূর্ণ পুনরুদ্ধারমূলক সুবিধা পায়, সেটিও বজায় রাখে। তবে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে বাড়বৃদ্ধির হরমোনের স্বাভাবিক নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন বিপাকজনিত সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও অন্যান্য মানসিক ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গবেষণাটি ইঁদুরের মস্তিষ্কে অত্যাধুনিক স্নায়ু-রেকর্ডিং ও নিউরাল ট্রেসিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই স্নায়ুপথের কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করেছে। এই ফলাফল বলছে, ঘুম কেবল বিশ্রামের সময় নয়। এটি এমন একটি সক্রিয় জৈবিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে শরীর নিজের ক্ষয়পূরণ করে এবং মস্তিষ্ককে পরবর্তী দিনের জন্য প্রস্তুত করে। এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে ঘুমের সমস্যা, বিপাকজনিত রোগ এবং স্নায়ুর অবক্ষয়জনিত রোগের নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে সহায়ক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। গবেষকদের পরামর্শ, প্রতিদিন পর্যাপ্ত সময় ধরে গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম শরীরের শক্তি, সুস্থতা এবং মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে।
সূত্র: University of California – Berkeley. “Scientists discover the deep sleep circuit that builds muscle, burns fat, and boosts the brain.” ScienceDaily, July 2026.
