গর্ভধারণ ও নারীমস্তিষ্কের রূপান্তর 

গর্ভধারণ ও নারীমস্তিষ্কের রূপান্তর 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৭ আগষ্ট, ২০২৬

মাতৃত্বের প্রতিটি যাত্রাই একজন নারীর শরীর ও মনের এক নতুন অভিযোজনের গল্প। তবে দ্বিতীয়বার গর্ভধারণ শুধুই প্রথম অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি নয়। এই অভিজ্ঞতা আবার মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ নতুন ধরনের পরিবর্তন ঘটায়। এমনই এক তথ্য উঠে এসেছে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল সেন্টার (আমস্টারডাম ইউ এম সি)-এর খুব সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। এই গবেষণার বিবরণ নেচার কমিউনিকেশন্স পত্রিকায় বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। দেখা গেছে, প্রতিটি গর্ভধারণই মায়ের মস্তিষ্কে স্বতন্ত্র স্নায়বিক ছাপ রেখে যায়। এই আবিষ্কারটি ভবিষ্যতে মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্য, বিশেষ করে প্রসবোত্তর বিষণ্ণতা শনাক্ত করা ও চিকিৎসায় পথ দেখাবে আশা করা যায়।

এর আগেও একই গবেষক দল প্রথম দেখিয়েছিলেন, গর্ভধারণ নারীর মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যপ্রণালীতে বিশেষ পরিবর্তন আনে। এবার তারা ১১০ জন নারীকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কেউ প্রথম সন্তানের মা হতে যাচ্ছিলেন, কেউ দ্বিতীয়বার গর্ভবতী ছিলেন, আবার কেউ গর্ভধারণ করেননি। একাধিক এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে গবেষকেরা সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের পরিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করেন।

ফলাফলে দেখা যায়, প্রথম গর্ভধারণের সময় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটে মস্তিষ্কের ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্কে, যা কিনা আত্ম-উপলব্ধি, সামাজিক সম্পর্ক বোঝা, অন্যের অনুভূতি অনুধাবন এবং মানসিক প্রতিফলনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে জড়িত। দ্বিতীয় গর্ভধারণেও এই নেটওয়ার্কে পরিবর্তন ঘটে, তবে তার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। বরং এবার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায় মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশের সংকেত শনাক্তকরণ এবং সংবেদনশীল তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত স্নায়বিক নেটওয়ার্কে। গবেষকদের ধারণা, একাধিক সন্তানের যত্ন নেওয়ার বাস্তব চাহিদা পূরণে এই পরিবর্তনগুলো মায়ের মস্তিষ্ককে আরও কার্যকরভাবে প্রস্তুত করে।

এই গবেষণার হাত ধরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে। মস্তিষ্কের গর্ভধারণজনিত পরিবর্তনের সঙ্গে মা ও শিশুর আবেগগত বন্ধনের স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক বেশি শক্তিশালী হলেও দ্বিতীয় সন্তানের সময় তা কিছুটা ভিন্ন রূপ নেয়। একই সঙ্গে গবেষকেরা প্রথমবারের মতো প্রমাণ পেয়েছেন যে গর্ভাবস্থায় মস্তিষ্কের কর্টেক্সে ঘটা কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে প্রসবোত্তর বিষণ্নতারও সম্পর্ক রয়েছে।

তবে এই সম্পর্কের সময়কাল দুই ধরনের মায়ের ক্ষেত্রে এক নয়। প্রথমবার মা হওয়া নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান জন্মের পর এই পরিবর্তন ও বিষণ্নতার সম্পর্ক বেশি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। অন্যদিকে, দ্বিতীয়বার গর্ভধারণকারী নারীদের ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ক গর্ভাবস্থায় থাকাকালীনই বেশি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। এর ফলে ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের আরও আগে শনাক্ত করা যেতে পারে।

গবেষকদের মতে, মাতৃত্ব নারীর মস্তিষ্ককে প্রতিবারই নতুনভাবে অভিযোজিত হতে শেখায়। প্রতিটি গর্ভধারণ মস্তিষ্ককে নতুন বাস্তবতার জন্য পুনর্গঠিত করে, যাতে মা তার সন্তানের চাহিদা আরও দক্ষতার সঙ্গে পূরণ করতে পারেন। এই গবেষণা একজন নারীর মাতৃত্বকালীন মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নত করার সম্ভাব্য ইঙ্গিত দিয়েছে। আশা রাখা যায় এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান ভবিষ্যতে প্রসবোত্তর বিষণ্নতা প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং আরও কার্যকর চিকিৎসা কৌশল উদ্ভাবনে সহায়তা করবে।

সূত্র: M. Straathof, S. Halmans, P. J. W. Pouwels, E. A. Crone, E. Hoekzema. The effects of a second pregnancy on women’s brain structure and function.published in Nature Communications, 2026; 17 (1) DOI: 10.1038/s41467-026-69370-8

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

16 − three =