গুপ্ত দূষক মিথাইলসিলোক্সেন

গুপ্ত দূষক মিথাইলসিলোক্সেন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

বাতাসে এক নতুন ধরনের ‘গোপন দূষক’ ছড়িয়ে পড়েছে। এতদিন এ প্রায় নজরেই আসেনি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, মিথাইলসিলোক্সেন নামক সিলিকন-ভিত্তিক রাসায়নিক যৌগ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বাতাসে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছে নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট ইউনিভার্সিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব গ্রোনিনজেন। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে অ্যাটমোস্ফেরিক কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ফিজিক্স জার্নালে।

মিথাইলসিলোক্সেন যৌগটি মূলত সিলিকন-ভিত্তিক উপাদান থেকে তৈরি। এগুলো বহুল ব্যবহৃত হয় প্রসাধনী সামগ্রী, ব্যক্তিগত যত্নপণ্য, শিল্পকারখানার নানা উপকরণ, লুব্রিকেন্ট এবং গাড়ির ইঞ্জিন তেলে। ধারণা ছিল, এসব রাসায়নিক পরিবেশের পক্ষে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, বাস্তবে এগুলো বাতাসে অনেক বেশি পরিমাণে উপস্থিত।

গবেষকরা শহর, বনাঞ্চল এবং উপকূলীয় অঞ্চলসহ নানা পরিবেশে বাতাসের নমুনা পরীক্ষা করেন। দেখা যায়, বায়ুমণ্ডলের জৈব অ্যারোসলের মোট ভরের ২% থেকে ৪.৩% পর্যন্ত অংশ জুড়ে রয়েছে এই মিথাইলসিলোক্সেন। অর্থাৎ, বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র কণাগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশই এই যৌগ দিয়ে গঠিত। এটিকে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় পাওয়া গেছে বড় শহরাঞ্চলে। উদাহরণ হিসেবে ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে প্রায় ৯৮ ন্যানোগ্রাম পর্যন্ত মিথাইলসিলোক্সেন শনাক্ত হয়েছে। তবে বিষয়টি শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নয়—দূরবর্তী বনাঞ্চলেও এই রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, এটি সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই দূষণের অর্ধেকেরও বেশি উৎস হলো যানবাহন চলাচল, বিশেষ করে ইঞ্জিন তেল ও লুব্রিকেন্ট। গাড়ির ইঞ্জিন চালু থাকা অবস্থায় ক্ষুদ্র কণা ও বাষ্পের সঙ্গে এসব যৌগ বাতাসে মিশে যায়। সমস্যা হলো, অন্যান্য অনেক দূষকের মতো এগুলো দ্রুত ভেঙে যায় না। বরং অত্যন্ত স্থিতিশীল হওয়ায় অনেক দূর পর্যন্ত বাতাসে ভেসে যেতে পারে। এতে মানবস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গবেষকরা বলছেন, মানুষ হয়তো প্রতিদিন এমন পরিমাণ মিথাইলসিলোক্সেন শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করছে, যার পরিমাণ PFAS বা মাইক্রোপ্লাস্টিকের তুলনায়ও বেশি হতে পারে। তবে এখনো এদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।

এছাড়া এই যৌগ জলবায়ুতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এটি বাতাসের অ্যারোসল কণার আচরণ বদলে দিতে পারে, যা মেঘ গঠন, সূর্যালোক প্রতিফলন এবং বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক বিক্রিয়া পরিবর্তন করতে সক্ষম।

গবেষকদের মতে, মিথাইলসিলোক্সেন নিয়ে দ্রুত আরও গবেষণা প্রয়োজন। এই দূষক পদার্থটি এতদিন আমাদের চোখের আড়ালে ছিল, কিন্তু এখন স্পষ্ট হচ্ছে—এর প্রভাব মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশ উভয়ের জন্যই বেশ ক্ষতিকারক হতে পারে।

 

সূত্র: Theory of everything, Utrecht University / Atmospheric Chemistry and Physics (2026).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − 9 =