গ্যাসীয় চাপের উৎস

গ্যাসীয় চাপের উৎস

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অসংখ্য পরমাণু ও অণু যখন কোনো পৃষ্ঠে ধাক্কা মারে, সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংঘর্ষের সম্মিলিত ফলই তৈরি করে চাপ। সে অর্থে গ্যাসের চাপ আমাদের চারপাশে সর্বক্ষণই উপস্থিত। অথচ তার প্রকৃত উৎস চোখে দেখা যায় না। এবার বিজ্ঞানীরা একটি ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক কণার সঙ্গে একক গ্যাসীয় পরমাণু বা অণুর সংঘর্ষের প্রভাব আলাদা করে শনাক্ত করেছেন। গবেষণাটির বিবরণ ফিজিক্যাল লেটার রিভিউতে প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়েছে। এই নতুন পদ্ধতি ভবিষ্যতে অতি-উচ্চ শূন্যতায় চাপ নির্ণয়ের নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। এটি কোয়ান্টাম তত্ত্বের সীমা পরীক্ষা এবং নতুন কণার সন্ধানে কাজে লাগতে পারে।

এই গবেষণাটির নেতৃত্ব দিয়েছেন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ও কণা-পদার্থবিদ ডেভিড মুর। তাঁর দল প্রায় ১০০ ন্যানোমিটার ব্যাসের সিলিকন ডাই-অক্সাইডের একটি গোলককে লেজারের সাহায্যে বায়ুশূন্য কক্ষে ভাসিয়ে রাখেন। গোলকটি লেজারের আলোর ফাঁদে স্প্রিংয়ে বাঁধা বলের মতো সামান্য সামনে-পেছনে দুলছিল। গোলকের অবস্থান বদলালে প্রতিফলিত লেজার আলোর তরঙ্গেও সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে। অত্যন্ত সংবেদনশীল ইন্টারফেরোমেট্রি পদ্ধতিতে সেই পরিবর্তন মেপে গবেষকেরা গোলকের গতিবিধি নির্ণয় করেন।

এরপর বায়ুশূন্য কক্ষে অত্যন্ত অল্প পরিমাণ গ্যাস ঢোকানো হয়। বায়ুমণ্ডলীয় চাপের দশ-বিলিয়ন ভাগেরও কম। ব্যবহার করা হয় ভারী ক্রিপটন ও জেনন গ্যাস এবং আণবিক সালফার হেক্সাফ্লোরাইড গ্যাস। কোনো পরমাণু বা অণু গোলকটিকে আঘাত করলে তার গতিবেগ ও ভরবেগে সামান্য পরিবর্তন ঘটে। এই ক্ষুদ্র ধাক্কাটাই পরীক্ষার মূল সংকেত।

তবে সমস্যা হল, গোলকটি শুধু যে গ্যাসের কণার ধাক্কায় নড়ছিল তা নয়। অবশিষ্ট জলীয় অণু এবং লেজারের ফোটনের সংঘর্ষও একই ধরনের শব্দ তৈরি করছিল। তাই গবেষকেরা LIGO-র মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণ কৌশল অনুসরণ করে পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করা নির্দিষ্ট সংকেতের ছাঁচের সঙ্গে বাস্তব তথ্য মিলিয়ে পৃথক সংঘর্ষ শনাক্ত করেন। ফলে প্রতিটি আঘাতে গোলকের ভরবেগ কতটা বদলেছে, সেটিও নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

একই সময়ে ই টি এইচ জুরিখ-এর গবেষকেরাও প্রায় একই ধরনের ফল পেয়েছেন। তাঁদের পরীক্ষায় নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তিশালী জেনন পরমাণুর রশ্মি ন্যানোকণার ওপর নিক্ষেপ করা হয় এবং সংঘর্ষের দিক সম্পর্কেও কিছু তথ্য পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে মহাকাশের নির্দিষ্ট দিক থেকে আসা অজানা কণা শনাক্ত করতে এই ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এই প্রযুক্তির আরেকটি সম্ভাবনা আছে কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যায়। বড় কোনো ভাসমান কণাকে একই সময়ে দুটি অবস্থানে থাকা এক অদ্ভুত কোয়ান্টাম দশায় রাখা গেলে, আশপাশের গ্যাসের পরমাণুর সংঘর্ষ সেই অবস্থা ভেঙে দিতে পারে। তাই এমন পরীক্ষা থেকে বোঝা যাবে, দীর্ঘস্থায়ী কোয়ান্টাম অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য কতটা নিখুঁত শূন্যস্থান প্রয়োজন। এছাড়া সংঘর্ষ গুণে অতি-উচ্চ শূন্যস্থানে চাপের একটি মৌলিক মানদণ্ড তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে – যেভাবে পারমাণবিক ঘড়ি সময়ের একটি মানদণ্ড নির্ধারণ করে। তবে প্রযুক্তিটি এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

মুরের পরিকল্পনা আরও উচ্চাভিলাষী। তিনি ন্যানোকণায় ফ্লোরিন-১৮ যুক্ত করার পরিকল্পনা করেছেন। ফ্লোরিন-১৮ এমনই এক কেন্দ্রক যা ইলেকট্রন শুষে নিতে পারে, আবার একই সঙ্গে ছুড়ে দিতে পারে নিউট্রিনো কণা, যা কার্যত শনাক্ত করা অসাধ্য। ছিটকে-পালানো এই নিউট্রিনো কণা হয়তো ন্যানোকণাটিকে এমন এক ধাক্কা কষাতে পারে যা পর্যবেক্ষণযোগ্য। আর তা যদি হয় তাহলে নিউট্রিনোর ভর মাপা হয়তো সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, সাধারণ একটা নিউট্রিনো কণা কখনো কখনো রূপ বদলে আরও বেশি ভরযুক্ত “নির্বীজ” নিউট্রিনোয় পরিণত হয় কিনা, তাও যাচাই করা হবে। যে-ডার্ক ম্যাটারের খোঁজে বিজ্ঞান হন্যে হয়ে রয়েছে, সে ব্যাপারেও এটা কাজে লাগবে।

 

সূত্র: Physicists detect the tiny atomic collisions that give a gas its pressursicists detect the tiny atomic collisions that give a gas its pressure, Science, 10 Sep 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 + 2 =