চাঁদে আছড়ে পড়ল বেলাগাম রকেট ফ্যালকন ৯ 

চাঁদে আছড়ে পড়ল বেলাগাম রকেট ফ্যালকন ৯ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ আগষ্ট, ২০২৬

আমেরিকার মহাকাশ ও মহাকাশযান সংস্থা স্পেসএক্স থেকে উৎক্ষিপ্ত ফ্যালকন ৯ রকেট প্রায় দেড় বছর ধরে মহাকাশে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে । অবশেষে তার একটি অংশ দ্বিতীয় ধাপে এসে আজ অর্থাৎ বুধবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমেরিকার সময় অনুযায়ী সকালে চাঁদের পৃষ্ঠে আঘাত হেনেছে। রকেটের এই টুকরোটির ওজন প্রায় ৪ টনের কাছাকাছি। হিসেব যা বলছে, এটি ঘণ্টায় প্রায় ৮,৬৯০ কিলোমিটার বেগে চাঁদের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত আইনস্টাইন ক্রেটার অঞ্চলে আছড়ে পড়েছে। নাসার ভূ-বিজ্ঞানী জিমি রাসেল আশ্বস্ত করে বলেছেন, পৃথিবীর জন্য এতে কোনো ঝুঁকি না থাকলেও সংঘর্ষটি চাঁদের বুকে নতুন একটি গহ্বর সৃষ্টি করবে। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে চাঁদের ভূ-তত্ত্ব ও মহাকাশ বর্জ্যের প্রভাব সম্পর্কে নতুন তথ্য সংগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবেই দেখছেন।

ফ্যালকন ৯ রকেটের এই অংশটি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেসের একটি চন্দ্র অবতরণ মিশন উৎক্ষেপণের সময় ব্যবহৃত হয়েছিল। পৃথিবীর কক্ষপথে পরিচালিত অধিকাংশ অভিযানে ব্যবহৃত রকেটের অংশগুলো ধাপে ধাপে পরে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যায় বা সমুদ্রে পড়ে। কিন্তু চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রার জন্য অতিরিক্ত গতিবেগ অর্জনের প্রয়োজন হওয়ায় এবং ফ্যালকন ৯ রকেটের এই অংশটির দ্বিতীয় ধাপে এসে জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় পৃথিবীতে আর ফিরে আসেনি। সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাকাশে ভাসতে থাকে। পরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এর কক্ষপথ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হন যে সূর্য ও চাঁদের সম্মিলিত মহাকর্ষীয় প্রভাবে এটি অবশ্যম্ভাবীভাবে চাঁদের দিকে ধাবিত হয়েছে।

নাসার পূর্বাভাস অনুযায়ী, সংঘর্ষের ফলে প্রায় ১৮ মিটার প্রশস্ত এবং চার মিটার গভীর একটি নতুন ক্রেটার/গর্ত তৈরি হবে। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ চন্দ্রধূলি ও শিলাখণ্ড চারদিকে ছিটকে পড়বে। যদিও সূর্যের আলোয় এই ধুলোর মেঘ এতোটাই তীব্র আলোকিত হবে যে, পৃথিবী থেকে খালি চোখে তা দেখা প্রায় অসম্ভব হবে।

নাসা জানিয়েছে, তারা সংঘর্ষের আগে ও পরে ওই এলাকার ছবি ও বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট সংঘর্ষের ফলে চাঁদের পৃষ্ঠে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, ধুলোর বিস্তার কেমন হয় এবং ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযান পরিচালনায় এসব তথ্য কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে আরও ভালো ধারণা পাবেন। একই সঙ্গে মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো বস্তুগুলোর গতিপথ নির্ণয়ের প্রযুক্তিও আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা পৃথিবীর জন্য বিপজ্জনক নয়, তবে এটি মহাকাশ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। সাধারণত রকেটের ব্যবহৃত ধাপগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরে এসে পুড়ে যায় অথবা সমুদ্রে পড়ে। কিন্তু চাঁদ বা আরও দূরের গন্তব্যে অভিযানের ক্ষেত্রে অনেক সময় এসব অংশ মহাকাশে অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থেকে যায়। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ এড়াতে মহাকাশযানের অবশিষ্ট অংশর নিরাপদ নিষ্পত্তি করার আরও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

চাঁদে মহাকাশ বর্জ্যের আঘাত খুবই বিরল ঘটনা। এর আগে ২০২২ সালে একটি চীনা রকেটের অংশ এবং ২০০৯ সালে নাসার একটি রকেটকে দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে চাঁদে আঘাত করানো হয়েছিল গবেষণার উদ্দেশ্যে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার লুনা-২৫, ভারতের চন্দ্রযান-২ এবং ইসরায়েলের বেরেশিট চন্দ্রযানও অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়েছিল। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় স্পেসএক্সের এই অনিয়ন্ত্রিত সংঘর্ষ মহাকাশ বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতের চন্দ্র অভিযানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোকপাত করবে। নাসা ও স্পেসএক্স ইতোমধ্যেই ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।

সূত্র: SpaceX rocket about to crash into the moon in unintentional collision | SpaceX | The Guardian, What is happening: the spent upper stage of a Falcon 9, catalogued 2025-010D, is predicted to hit the Moon on August 5, 2026 at 06:34:32 UTC, about 2:34 a.m. Eastern, at 2.43 km per second (roughly 5,400 mph).

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − 3 =