সম্প্রতি বিজ্ঞান পত্রিকা দ্য ল্যান্সেট প্লানেটারি হেলথ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে জলবায়ু পরিবর্তন শুধু তাপপ্রবাহ, বন্যা বা খরার মতো পরিবেশগত সংকটই তৈরি করছে না, এর ফলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারও দ্রুত হচ্ছে। আগে মনে করা হতো যে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহারই প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরির প্রধান কারণ। কিন্তু নতুন এই গবেষণা দেখাচ্ছে যে বিশ্ব উষ্ণায়নও এই সমস্যাকে আরও জটিল ও বিপজ্জনক করে তুলছে।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ১৯৪০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বের ১৩৯টি দেশ থেকে সংগৃহীত ৪ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি স্যালমোনেলা ব্যাকটেরিয়ার জিনোম বিশ্লেষণ করেছেন। দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিনের উপস্থিতি প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্যালমোনেলা খাদ্যবাহিত রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। দূষিত খাবার বা জলের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং ডায়রিয়া, জ্বর ও অন্যান্য গুরুতর সংক্রমণ ঘটাতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, আলোচিত দেশগুলোর প্রায় ৮২ শতাংশেই এই ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং সাহারা- নিম্ন আফ্রিকার দেশগুলোতে এই প্রবণতা বেশি।
বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেছেন যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টিপাতের ধরণে পরিবর্তন ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তনকে প্রভাবিত করে। উষ্ণ পরিবেশে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং তাদের মধ্যে জিন বিনিময়ের হার বেড়ে যায়। এর ফলে প্রতিরোধী জিন এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়ায় সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষ, প্রাণী এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে রোগজীবাণুর চলাচলও বৃদ্ধি পায়, যা প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে যদি বর্তমান হারে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ চলতে থাকে, তাহলে ২১০০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের সংকট আরও গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। তাই শুধু অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা দুটি সমান্তরাল পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন। প্রথমত, অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অনুযায়ী বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ করতে হবে। পাশাপাশি মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশকে একক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে “ওয়ান হেলথ” পদ্ধতি এবং কার্যকরী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণে ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। নতুন এই গবেষণা থেকে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে , জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্য আসলে একই সুতোয় গাঁথা। পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বাড়বে, ততই বাড়বে এমন জীবাণুর ঝুঁকি, যাদের বিরুদ্ধে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ক্রমশ অসহায় হয়ে পড়তে পারে। তাই জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন নয়, মানবস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ চিকিৎসাব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখারও অপরিহার্য শর্ত।
সূত্র: https://doi.org/10.1038/d41586-023-04077-0
