জিন-সম্পাদনার পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় শিশুমৃত্যু

জিন-সম্পাদনার পরীক্ষামূলক চিকিৎসায় শিশুমৃত্যু

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৪ আগষ্ট, ২০২৬

জিন-সম্পাদনা (বেস এডিটিং) চিকিৎসার প্রাণঘাতী এক পরীক্ষামূলক ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে অবশেষে তদন্ত শুরু করেছে চীনের সাংহাই জিয়াও টং ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিন। ২০২৫ সালের মার্চে ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি গোপন রাখা হয়েছিল। সায়েন্স অ্যান্ড রিট্র্যাকশন ওয়ার্ক-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ঘোষণা করেছে। জানানো হয়েছে কোনো অনিয়ম বা নীতি লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শিশুটির পরিচয় প্রকাশ্যে আনা হয়নি তাই তাকে মেই ছদ্মনামটি দেওয়া হয়েছে। এই শিশুটি এক বিরল জিনগত ত্রুটিতে আক্রান্ত হয়েছিল, যে কারণে তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছিল। এই ত্রুটি সংশোধনের লক্ষ্যে স্নায়ুবিজ্ঞানী জিলং চিউর নেতৃত্বে একটি পরীক্ষামূলক বেস-এডিটিং থেরাপি প্রয়োগ করা হয়। চিকিৎসার অংশ হিসেবে ট্রিলিয়ন সংখ্যক ভাইরাসবাহিত ভেক্টরের মাধ্যমে জিন-সম্পাদনার উপাদান মেরুদণ্ডের তরল মারফত শিশুটির কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শরীরে মারাত্মক রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই মৃত্যুর কারণ হয় বলে হাসপাতালের পর্যালোচনা কমিটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।

তদন্তে উঠে এসেছে বেশ কিছু উদ্বেগজনক তথ্য। শিশুটির বাবা-মায়ের দেওয়া নথি অনুযায়ী, মানবদেহে এই থেরাপি প্রয়োগের আগে বানরের ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় চারটি প্রাণীর শরীরে গুরুতর অঙ্গক্ষতির প্রমাণ মিলেছিল। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য হাসপাতালের নৈতিক পর্যালোচনা বোর্ডের সামনে উপস্থাপনই করা হয়নি বলে অভিযোগ। ফলে জিন থেরাপি ও বায়োএথিক্স বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই প্রশ্ন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা যাচাই না করেই এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল অনুমোদন কি করে দেওয়া হয়েছিল?

আরও বিতর্কিত বিষয় হল চিকিৎসার অর্থায়নের বিষয়টি। শিশুটির পরিবার দাবি করেছে, সম্ভাব্য এই থেরাপির জন্য তারা ৮ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। শিশুর মৃত্যুর পর তারা গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে ছিলেন। কিন্তু তাই সত্ত্বেও পরে নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণায় মৃত্যুর ঘটনা, প্রাণী পরীক্ষায় দেখা গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা পরিবারের আর্থিক অবদানের কোনো উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে গবেষণার স্বচ্ছতা ও প্রকাশনার নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে গবেষণা প্রধান জিলং চিউ সায়েন্স পত্রিকার সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি। তবে তিনি চীনের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে জানিয়েছেন, এ সংক্রান্ত সব প্রশ্নের জবাব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই দেবে।

২৬ জুলাই প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সাংহাই জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, তারা গবেষণার সততা, চিকিৎসা সংক্রান্ত নৈতিকতা এবং বৈজ্ঞানিক মান বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিযোগের প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখা হবে এবং তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোরতম প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিশুটির বাবা-মাও জানিয়েছেন, তদন্তে সহযোগিতা করতে তারা প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় সব তথ্য-প্রমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে তুলে দেবেন।

এই ঘটনাটি জিন-সম্পাদনা প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি একটি জ্বলজ্যান্ত সতর্কবার্তাও বটে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা যতই দ্রুত হোক না কেন, রোগীর নিরাপত্তা, গবেষণার স্বচ্ছতা এবং কঠোর নৈতিক তদারকি নিশ্চিত না হলে সেই অগ্রগতি কখনও কখনও মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

 

সূত্র: Death of girl in Chinese gene-editing trial was never made public BY Brendan Borrell, Retraction Watch,26th july2026, doi: 10.1126/science.zozlm7h.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × two =