প্রায় দশক দুয়েক আগে সাইবেরিয়ার একটি গুহায় পাওয়া একটি ছোট্ট আঙুলের হাড়ের DNA বিশ্লেষণ থেকেই ডেনিসোভান মানবগোষ্ঠীর অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এই মানবগোষ্ঠী নিয়ান্ডারথাল ও আধুনিক মানুষের ঘনিষ্ঠ বিবর্তনী আত্মীয়। এদের সম্পর্কে এত দিন তথ্য ছিল অত্যন্ত সীমিত। কারণ তাদের জীবাশ্মের সংখ্যা খুবই কম। এবার তাইওয়ানের কাছে সমুদ্রতল থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি পায়ের হাড় সেই প্রাচীন মানবগোষ্ঠী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য তুলে ধরেছে।
জাপান ও তাইওয়ানের গবেষকদের নতুন দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, একটি উরুর হাড়/ ফিমার এবং একটি আংশিক টিবিয়া সম্ভবত ডেনিসোভানদের। হাড়গুলিতে সংরক্ষিত প্রাচীন প্রোটিনের সঙ্গে পূর্বে আবিষ্কৃত ডেনিসোভান জীবাশ্মের প্রোটিনের মিল পাওয়া গেছে। হাড়ের দৈর্ঘ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা অনুমান করেছেন, সংশ্লিষ্ট দুই ডেনিসোভানের উচ্চতা ছিল প্রায় ১৮০ ও ১৯০ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ, তারা সেই সময়কার অধিকাংশ নিয়ান্ডারথাল ও প্রাচীন আধুনিক মানুষের তুলনায় যথেষ্ট লম্বা ছিল। তাই বলে তারা দানবাকৃতি মানুষ ছিল না। গবেষণা অনুযায়ী, নিয়ান্ডারথাল পুরুষদের গড় উচ্চতা ছিল প্রায় ১৬৮ সেন্টিমিটার এবং সেই সময়ের হোমো সেপিয়েন্স পুরুষদের গড় উচ্চতা প্রায় ১৭৫ সেন্টিমিটার। নতুন আবিষ্কার তাই ডেনিসোভানদের শুধু বড় মস্তিষ্ক নয়, তুলনামূলকভাবে বড় ও দীর্ঘ দেহের অধিকারী হিসেবেও চিহ্নিত করছে।
ডেনিসোভানদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কেও মিলেছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। একটি টিবিয়ায় থাকা নাইট্রোজেন আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বুঝতে পেরেছেন যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রচুর মাংস খেতেন। তার খাদ্যতালিকায় স্থলচর তৃণভোজী প্রাণীর মাংসের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। বিপরীতে, মাছ বা অন্যান্য সামুদ্রিক খাবার খাওয়ার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রায় ৪৫ হাজার বছর আগে পৌঁছানো আধুনিক মানুষের খাদ্যাভ্যাস তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময় ছিল। সেদিক থেকে দেখতে গেলে ডেনিসোভানদের খাদ্যাভ্যাস হয়তো আধুনিক মানুষের তুলনায় কম বৈচিত্র্যময় ছিল।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো জীবাশ্মগুলোর বয়স। আগে এগুলোর বয়স প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার বছর বলে অনুমিত হয়েছিল। নতুন রেডিওকার্বন বিশ্লেষণে বয়স দাঁড়িয়েছে মাত্র প্রায় ৪৫ হাজার বছর। ফলে এই জীবাশ্মগুলো এখনও পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে কমবয়সি এবং নির্ভরযোগ্যভাবে তারিখ নির্ধারিত ডেনিসোভান জীবাশ্মগুলোর মধ্যে পড়ে।
আশা করা যায়, তাইওয়ানের কাছে সমুদ্রতল থেকে তোলা এই বিপুল জীবাশ্মভাণ্ডার ভবিষ্যতে ডেনিসোভানদের জীবন, দেহগঠন ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে আরও তথ্য দেবে। গবেষকদের দৃঢ় বিশ্বাস, সেখানে এখনও এমন অনেক হাড় রয়েছে, যা এশিয়া নিবাসী এই অজ্ঞাত প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর ইতিহাসকে স্পষ্টতর করে তুলে ধরবে।
সূত্র: doi: 10.1126/science.z1x53v7
