তেজস্ক্রিয় পদার্থের পরিচয় জানতে হলে শুধু বিকিরণ শনাক্ত করলেই চলে না, জানতে হয় তার শক্তিও। কারণ, বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে নির্গত বিকিরণের শক্তি অনেক সময় কাছাকাছি মাত্রার হয়। সেই সূক্ষ্ম পার্থক্য ধরতেই নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে ল্যান্থানাম ব্রোমাইডের বিশেষ কেলাস। এই কেলাস ব্যবহার করে তৈরি যন্ত্র দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ শনাক্ত করতে পারে। সীমান্তে পারমাণবিক নজরদারি, পরিবেশে তেজস্ক্রিয় দূষণ পরীক্ষা এবং খনিতে মূল্যবান খনিজের সন্ধানে এই প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে। তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে বেরিয়ে আসা উচ্চশক্তির গামা রশ্মি যখন বিশেষ কেলাসকে আঘাত করে, তখন কেলাসটির মধ্যে ক্ষণস্থায়ী আলোর ঝলক তৈরি হয়। যন্ত্র সেই আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে বদলে দেয়। সেই সংকেতের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, বিকিরণটির শক্তি কত এবং সেটি কোন ধরনের তেজস্ক্রিয় পদার্থ থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এত দিন এই কাজে বহুল ব্যবহৃত হত সোডিয়াম আয়োডাইডের কেলাস। কাছাকাছি শক্তির বিকিরণ আলাদা করে চেনার ক্ষেত্রে তার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে, জার্মেনিয়াম-ভিত্তিক যন্ত্র অনেক বেশি নিখুঁত হলেও সেগুলিকে সাধারণত অত্যন্ত ঠান্ডা করে রাখতে হয়। ফলে সেগুলির ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ তুলনামূলকভাবে জটিল।ল্যান্থানাম ব্রোমাইড এই দুই প্রযুক্তির মাঝামাঝি একটি কার্যকর সমাধান। সেরিয়াম মেশানো এই কেলাসটি প্রায় ২৫ ন্যানোসেকেন্ডে আলোর সংকেত তৈরি করে। অর্থাৎ, অত্যন্ত দ্রুত পরপর আসা বিকিরণও শনাক্ত করা সম্ভব। পাশাপাশি, ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেই যন্ত্রটি কাজ করতে পারে। সীমান্তে তল্লাশির সময় চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থ এবং বিপজ্জনক পারমাণবিক পদার্থকে আলাদা করে চেনা জরুরি। এদের বিকিরণের শক্তি কাছাকাছি হলেও ল্যান্থানাম ব্রোমাইডের উন্নত শনাক্তকরণ ক্ষমতা সেই পার্থক্য ধরতে সাহায্য করে। পরিবেশ পর্যবেক্ষণেও রয়েছে এর ব্যবহার। জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর আশপাশের এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থের উপস্থিতি পরীক্ষা করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। মাটি, কৃষিজমি এবং জলপ্রবাহে তেজস্ক্রিয় দূষণ খুঁজে দেখতেও এটি কার্যকর। খনিতে এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। নিউট্রন দিয়ে কোনও নমুনার পরমাণুকে উত্তেজিত করলে সেখান থেকে নির্দিষ্ট শক্তির গামা রশ্মি বেরিয়ে আসে। সেই বিকিরণ বিশ্লেষণ করে নমুনায় কী কী মৌল রয়েছে, তা জানা যায়। এই পদ্ধতিতে খনির কাঁচামালের মধ্যে লিথিয়াম বা বিরল মৃত্তিকা মৌলের মতো মূল্যবান উপাদান আছে কি না, তা দ্রুত পরীক্ষা করা সম্ভব।
সেরিয়াম ও স্ট্রনশিয়াম মিশিয়ে প্রযুক্তি নির্মাতা এক্সেলিটাস টেকনোলজিস ল্যান্থানাম ব্রোমাইডের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করেছে। সংস্থাটির দাবি, বিশেষভাবে তৈরি এই কেলাসে আলোর উৎপাদন বাড়ে এবং বিকিরণের শক্তি নির্ণয় আরও নিখুঁত হয়। উপযুক্ত পরিস্থিতিতে এর শক্তি-বিচ্ছিন্ন করার ক্ষমতা প্রায় ২.২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
সব মিলিয়ে, দ্রুত সংকেত তৈরি, কাছাকাছি শক্তির বিকিরণ আলাদা করে চেনা এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কাজ করার সুবিধা- এই তিনটি বৈশিষ্ট্য ল্যান্থানাম ব্রোমাইডকে তেজস্ক্রিয়তা শনাক্তকরণের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি করে তুলছে।
সূত্র: physics world; October; 2026
