দাবানলের ধোঁয়ায় অকালমৃত্যু

দাবানলের ধোঁয়ায় অকালমৃত্যু

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২২ মে, ২০২৬

দাবানল মানেই স্থানীয় পরিবেশগত বিপর্যয়। এটাই ছিল ধারণা আপামর জনসাধারণের। দূরের বনের আগুনের ধোঁয়া শহরের আকাশে হালকা কুয়াশার মতো ভেসে এলেও সেটা সাধারণ দূষণের তুলনায় তেমন বিপজ্জনক নয় বলেই ধারণা করা হতো। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, এটাই তো গোড়ায় গণ্ডগোল। দাবানলের ধোঁয়ায় শুধু বনাঞ্চলের কাছাকাছি মানুষই নয়, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের ভিন্ন দেশ ও মহাদেশের মানুষও বিষাক্ত দূষণের শিকার হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও মারাত্মক হতে পারে বলেই ধারণা করা যাচ্ছে।

চীনের বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, দাবানলের ধোঁয়ায় এমন বহু জৈব রাসায়নিক যৌগ থাকে যেগুলো একপ্রকার বৈজ্ঞানিক নজরের বাইরে ছিল। এই যৌগগুলো বাতাসে ভেসে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে রাসায়নিকভাবে পরিবর্তিত হয়ে আরও বিপজ্জনক সূক্ষ্ম কণায় পরিণত হয়। বিশেষ করে PM2.5 মাত্রার অতিক্ষুদ্র দূষণকণা মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে রক্তপ্রবাহ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, প্রদাহ, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং রক্তনালীর ক্ষতির মতো গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দেয়।

গবেষকদের মতে, বর্তমানে দাবানল থেকে নির্গত জৈব দূষণ বিশ্বব্যাপী মানুষ্য সৃষ্ট দূষণের প্রায় সম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধোঁয়া দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে দুর্বল হয়ে যায় না; বরং বাতাসে চলাচলের সময় নতুন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে আবারও ক্ষতিকারক কণায় রূপ নেয়।

এইধরনেরই এক ভয়াবহ উদাহরণ দেখা গিয়েছিল ২০২৩ সালের কানাডার দাবানলে। সেই আগুনের ধোঁয়া শুধু উত্তর আমেরিকাই নয়, ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৫ কোটি ৪০ লাখ মানুষ অন্তত একদিনের জন্য এমন বায়ুদূষণের মুখোমুখি হয়েছিল যেখানে স্থানীয় দূষণের প্রধান উৎস ছিল কানাডার দাবানলের ধোঁয়া। এই ধোঁয়ার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ৫,৪০০ মানুষের আকস্মিক মৃত্যু ঘটে বলে অনুমিত। এছাড়া বিশ্বজুড়ে আরও প্রায় ৮২ হাজার অকালমৃত্যুর সঙ্গে এই দূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ পূর্বাভাস এসেছে ভবিষ্যৎ নিয়ে। গবেষকদের মতে, বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে দাবানলজনিত বায়ুদূষণে মৃত্যুর হার ছয় গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বছরে প্রায় ১৪ লাখ অকালমৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আফ্রিকা, কারণ সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সীমিত স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যাপক দাবানল ও তৃণভূমির আগুন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

দাবানল কেবল স্থানীয় বন ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি এখন বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ও জলবায়ু সংকটের অংশ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, উন্নত উপগ্রহভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং ধোঁয়ার রাসায়নিক বিশ্লেষণের নতুন প্রযুক্তি ছাড়া ভবিষ্যতের এই বিপদ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। কারণ আগুন হয়তো একটি দেশে জ্বলছে, কিন্তু তার বিষাক্ত ধোঁয়া শেষ পর্যন্ত পুরো পৃথিবীকেই আক্রান্ত করছে।

 

সূত্র: Wildfire smoke poses a chemical threat to global health

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 − two =