ছোট্ট জেব্রা ফিঞ্চ পাখি শুধু সুর শেখার দক্ষতার জন্যই নয়, মস্তিষ্কের এক বিস্ময়কর ক্ষমতার জন্যও বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে। নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এই পাখির মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ুকোষ বা নিউরন তৈরি হলে তারা পুরোনো কোষকে এড়িয়ে যায় না। বরং পরিণত মস্তিষ্ককোষের ভেতর দিয়েই সেগুলিকে ঠেলে, ধাক্কা মেরে নিজের গন্তব্যে পৌঁছে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে জেব্রা ফিঞ্চের মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁদের ধারণা ছিল, নতুন নিউরনগুলো পুরোনো কোষগুলির চারপাশ ধরে সাবধানে এগোবে। কিন্তু দেখা গেল, তারা সরাসরি মস্তিষ্কের কোষকলার ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে এগোচ্ছে। এগোবার পথে তারা আশপাশের কোষকে ঠেসে ধরে, সরিয়ে দেয় এবং বিদ্যমান সংযোগেও প্রভাব ফেলতে পারে। প্রধান গবেষক বেঞ্জামিন স্কটের কথায়, “নতুন কোষগুলো যেন ঘন জঙ্গলের মধ্যে নিজেরাই রাস্তা বানিয়ে এগিয়ে চলা অভিযাত্রী। এই ক্ষমতা জেব্রা ফিঞ্চকে দ্রুত নতুন শব্দ শেখা, নতুন দক্ষতা অর্জন এবং মস্তিষ্কে আঘাতের পর পুনর্জননে সাহায্য করে”। মানুষসহ অধিকাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্মের পর নতুন নিউরন তৈরির ক্ষমতা খুব সীমিত। কিন্তু পাখি, মাছ ও সরীসৃপদের মস্তিষ্কে সারা জীবন এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, মানুষের মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বিবর্তনের পথে নতুন কোষ তৈরির বদলে স্মৃতি রক্ষার স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ নতুন নিউরন যদি পুরোনো স্নায়ু-সংযোগ ভেঙে জায়গা করে নেয়, তবে তা স্মৃতির ক্ষতি করতে পারে। এই ধরনের “কোষ সুড়ঙ্গ খনন’’ আচরণ কিছু মেটাস্ট্যাটিক ক্যানসার কোষের মধ্যেও দেখা যায়। অর্থাৎ, শরীরে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসার কোষও আশপাশের টিস্যু ভেদ করে এগোতে একই কৌশল ব্যবহার করে। এতে বোঝা যায়, কোষের আক্রমণাত্মক চলাচলের পিছনে হয়তো একটি সাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়া কাজ করে। এই গবেষণার সম্ভাবনা চিকিৎসাবিজ্ঞানেও রয়েছে। এতদিন মনে করা হতো, নতুন নিউরনের চলাচলের জন্য বিশেষ গ্লিয়া স্ক্যাফোল্ড দরকার। কিন্তু জেব্রা ফিঞ্চের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এরকম কোন সহায়ক কাঠামো ছাড়াই নতুন কোষ এগোতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে মানুষের মস্তিষ্কে যদি আবার নিউরন তৈরির প্রক্রিয়া সক্রিয় করা যায়, তবে আলঝাইমার, পারকিনসনস বা মস্তিষ্কে আঘাতজনিত সমস্যার চিকিৎসায় নতুন পথ খুলতে পারে। এখন গবেষকেরা খুঁজে দেখছেন কোন জিন এই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নতুন কোষ কীভাবে অন্য কোষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক জায়গায় যুক্ত হয়। মানুষের মস্তিষ্কের ভবিষ্যৎ চিকিৎসার সম্ভাব্য দিশারি হয়ে উঠছে এই ছোট্ট জেব্রা ফিঞ্চ!
সূত্র: Neuroscience; April, 2026
