নরকাতঙ্ক: একটি জটিল মানসিক সমস্যা 

নরকাতঙ্ক: একটি জটিল মানসিক সমস্যা 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

নরক চিরন্তন শাস্তি বা মৃত্যু পরবর্তী চরম ভয়ানক পরিণতির প্রতীক। নরকের কোনো বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলেও, এই ভয় ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত একটি পরিচিত মানবিক অনুভূতি। এই ভয় তিলে তিলে তীব্র ও স্থায়ী হয়ে উঠে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, মানসিক শান্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ব্যাহত করে। তখন সেটি গুরুতর মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় রূপ নিতে থাকে। মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় এই ধরনের ভয়াল নরকাতঙ্কর অনুভূতি Stygiophobia বা Hadephobia নামে পরিচিত। এহেন পরিস্থিতিতে নরক, পাতাল বা চিরন্তন শাস্তির কথা মনে হলেই প্রবল আতঙ্ক, উদ্বেগ কিংবা অপরাধবোধ মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে। অনেক সময় কোনো ব্যক্তি নিজে যুক্তিগতভাবে এসব ধারণায় বিশ্বাস না করলেও কোনো কারণে বিষয়টা নিয়ে ভয়টি তার মনে গভীরভাবে থেকেই যায়।

এই ধরনের ভয়ের সঙ্গে ধর্মীয়-নৈতিক বিষয়কে ঘিরে অতিরিক্ত সংশয় ও অপরাধবোধের একটা সম্পর্ক রয়েছে। এটিকে মূলত অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার-এর একটি রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই ধরণের মানুষের মনের মধ্যে সবসময় চলতে থাকে টানাপড়েন – তিনি কি কোনো পাপ করেছেন, কোনো ভুল চিন্তা করে ধর্মীয় নিয়ম ভঙ্গ করেছেন, শেষ পর্যন্ত কি তাহলে ঠাঁই পেতে হবে নরকে? সাধারণ একটি কাজ বা চিন্তাকেও তখন গুরুতর নৈতিক অপরাধ বলে মনে হয়। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে বারবার প্রার্থনা, ক্ষমা চাওয়া, আশ্বাস খোঁজা বা একই বিষয় নিয়ে চিন্তা করা প্রভৃতি আচরণও দেখা যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো Religious Trauma Syndrome (RTS) বা ধর্মীয় আঘাতজনিত লক্ষণনিচয়। এটি অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত কোনো একক মানসিক রোগের নাম নয়। তবে কিছু মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করেন। এখানে কঠোর, কর্তৃত্ববাদী বা ভয়নির্ভর ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠার দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব দেখা যায়। ছোটবেলা থেকে যদি কাউকে বারবার নরক, শাস্তি, পাপ বা ঈশ্বরের ক্রোধের ভয় দেখানো হয়, তাহলে সেই ভয় পরবর্তী জীবনেও মনের গভীরে স্থায়ী হয়ে থাকে। এর ফলে আতঙ্কের আক্রমণ, অতিরিক্ত সতর্কতা, অনাহূত চিন্তা এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

নরকাতঙ্কের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিত্বের পরিপন্থী চিন্তাভাবনা। এই চিন্তাগুলি নিজের ইচ্ছায় মাথায় আসে না, হঠাৎ করেই চলে আসে। যেমন, আমি যদি ভুল করে থাকি, আমি কি শাস্তি পাব? আমি কি নরকে যাব? —এ ধরনের প্রশ্ন বারবার ফিরে ফিরে আসে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুক্তি দিয়ে মানুষ একদিকে বুঝতে পারে যে বর্তমানে তার কোনো বিপদ নেই, কিন্তু শরীর ও মস্তিষ্কের ভয়ের প্রতিক্রিয়া সেই অহেতুক চিন্তাভাবনাগুলোকেই বাস্তব বলে মনে করায়। ফলে সামান্য একটা ধর্মীয় শব্দ, ছবি, স্মৃতি বা আলোচনা পুরোনো আতঙ্ককে আবার নতুন করে উস্কে দেয়।

এই ভয়ের সঙ্গে অন্যান্য মানসিক সমস্যারও সম্পর্ক থাকতে পারে। এটি অতিরিক্ত নরক-ভয়, মৃত্যুভয়, সাধারণ উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং নেতিবাচক ধর্মীয় মোকাবিলা-পদ্ধতির সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে কঠোর ধর্মীয় পরিবেশ ছেড়ে বেরিয়ে আসা বা নিজের পুরোনো বিশ্বাস নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করা ব্যক্তিদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব বেশি দেখা যায়। বিশ্বাস পরিবর্তিত হলেও বহু বছরের ভয় ও অপরাধবোধ সহজে মন থেকে মুছে যায় না। ফলে ব্যক্তি একদিকে মনেপ্রাণে নিজের যুক্তিবোধ অনুসরণ করতে চান, অন্যদিকে পুরোনো শিক্ষার প্রভাবে অজানা আশঙ্কায় ক্রমাগত ভুগতে থাকেন।

তবে নরকাতঙ্ককে শুধুমাত্র সাধারণ উদ্বেগ বা ব্যক্তিত্বের অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। গবেষণার ইঙ্গিত অনুসারে, এই ভয় সবসময় ব্যক্তির সামগ্রিক উদ্বেগপ্রবণতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। বরং একজন ব্যক্তি নিজের নরকে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটা বলে মনে করছেন এবং ছোটবেলা থেকে কোন সব ধর্মীয় ধারণা কতটা গভীরভাবে নিজের মধ্যে গ্রহণ করেছেন, সেগুলোর ভূমিকাই এখানে প্রধান হতে পারে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সমস্যার প্রকৃতি অনুযায়ী পদ্ধতি নির্বাচন করা হয়। যদি নরকভয় OCD বা অত্যধিক বিবেকপরায়ণতার (scrupulosity)-এর অংশ হয়, তাহলে Exposure and Response Prevention (ERP)-সহ Cognitive Behavioral Therapy (CBT) কার্যকর হতে পারে। এতে রোগী ধীরে ধীরে ভয়ের উদ্দীপনার মুখোমুখি হন এবং বারবার আশ্বাস চাওয়া, প্রার্থনা বা অন্যান্য বাধ্যতামূলক আচরণের মাধ্যমে ভয় কমানোর চেষ্টা না করে সেই অস্বস্তি সহ্য করতে শেখেন। এ ছাড়া trauma-informed therapy-র মাধ্যমে অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মানসিক ও শারীরিক প্রভাব বোঝা এবং নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বোধবুদ্ধির পুনর্গঠন (Cognitive reframing) মারফত অতীতের ধর্মীয় বিপদ ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করা হয়। অর্থাৎ, অতীতের কোনো শাস্তির আশঙ্কাকে বর্তমান মুহূর্তের বাস্তব বিপদ হিসেবে না দেখে নিজের চিন্তা ও আবেগকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ তৈরি করা হয়।

মোটকথা, নরকাতঙ্ক শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়; কখনও কখনও এটি গভীর উদ্বেগ, ওসিডি, অপরাধবোধ বা ধর্মীয় আঘাতের সঙ্গে জড়িত একটি জটিল মানসিক অভিজ্ঞতাও বটে। তাই এমন ভয়কে উপহাস বা অবজ্ঞা না করে সহানুভূতির সঙ্গে বোঝা জরুরি। সঠিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা মানুষকে এই ধরনের ভয়ের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি নিজের বর্তমান জীবন ও বাস্তবতার ওপর আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সাহায্য করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − fifteen =