“ন্যানো-অ্যাকোয়ারিয়াম’’-এ পরমাণু দর্শন    

“ন্যানো-অ্যাকোয়ারিয়াম’’-এ পরমাণু দর্শন    

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২১ এপ্রিল, ২০২৬

তরলের ভিতরে পরমাণুরা কীভাবে নড়াচড়া করে, একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়, আবার ভেঙেও যায়- এসব ঘটনা এত ক্ষুদ্র যে সাধারণ চোখে তো দূরের কথা, উন্নত যন্ত্র দিয়েও দেখা কঠিন। কিন্তু এবার সেই অদৃশ্য জগতকে দেখার নতুন পথ দেখালেন বিজ্ঞানীরা। গ্রাফিন দিয়ে তৈরি ক্ষুদ্র “ন্যানো-অ্যাকোয়ারিয়াম’’-এ জৈব দ্রাবকের ভেতরে থাকা পরমাণুকে সরাসরি পারমাণবিক স্তরে দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের অধ্যাপক সারা হাইয়ের নেতৃত্বে এই গবেষণা হয়েছে। তাঁদের আশা, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও উন্নত ব্যাটারি, কার্যকর অনুঘটক, উন্নত ফিল্টার এবং নতুন শিল্পপ্রযুক্তি তৈরিতে সহায়তা করবে। কোনো মাছকে যেমন অ্যাকোয়ারিয়ামে রেখে দেখা যায়, তেমনি বিজ্ঞানীরা তরলের ভেতরে থাকা অতি ক্ষুদ্র কণাগুলো দেখার জন্য তৈরি করেছেন বিশেষ এক কক্ষ। তার নাম গ্রাফিন লিকুইড সেল বা “ন্যানো-অ্যাকোয়ারিয়াম’’। এখানে তরল নমুনাকে দুটি অত্যন্ত পাতলা স্তরের মাঝখানে আটকে রাখা হয়। এরপর ট্রান্সমিশন ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ (টিইএম) দিয়ে তার ছবি তোলা হয়। এই যন্ত্রে ইলেকট্রনের সূক্ষ্ম রশ্মি ব্যবহার করে এমন জিনিসও দেখা যায়, যা সাধারণ মাইক্রোস্কোপে দেখা অসম্ভব। এই কাজে গ্রাফিন বিশেষভাবে উপযোগী। কারণ এটি মাত্র এক পরমাণু পুরু কার্বনের স্তর, যা অত্যন্ত পাতলা, আবার অবিশ্বাস্যভাবে শক্ত। ফলে এটি যেন পরমাণু দেখার জন্য আদর্শ জানালা হয়ে ওঠে। ধারণাটি দারুণ, কিন্তু বাস্তবে ব্যবহার করা সহজ ছিল না। তরল নমুনা সিল করার সময় প্রায়ই শুকিয়ে যেত। ফলে নমুনার ঘনত্ব যেত বদলে এবং পরীক্ষার ফল অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। আরও বড় সমস্যা ছিল দ্রাবক। আগের ব্যবস্থায় গ্রাফিনকে ধরে রাখতে নরম পলিমার ব্যবহার করা হতো। কিন্তু অনেক জৈব দ্রাবক এই উপাদানের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারত না। তাই গবেষণা সীমাবদ্ধ ছিল মূলত জলভিত্তিক তরলে। এই বাধা দূর করতে গবেষকরা পলিমারের বদলে ব্যবহার করেছেন শক্ত সিরামিক সাপোর্ট। এটি রাসায়নিকভাবে অনেক বেশি স্থিতিশীল। ফলে পুরো যন্ত্রটি তরলের ভেতরেই সিল করা যায়। এতে নমুনা শুকিয়ে যায় না, আবার প্রায় যেকোনো ধরনের দ্রাবক ব্যবহার করা সম্ভব হয়। ফলত বিজ্ঞানীরা অনেক বেশি স্থির ও পরিষ্কার ছবি দেখতে পান। ছবি তোলাই তো শেষ কথা নয়। পারমাণবিক স্তরের ছবিতে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় সংকেত বা ব্যাঘাত থাকে। এগুলো সরাতে গবেষকরা নিউরাল নেটওয়ার্কভিত্তিক মেশিন লার্নিং ব্যবহার করেছেন। এই প্রযুক্তি ছবিকে পরিষ্কার করে, পরমাণুর অবস্থান নির্ভুলভাবে ধরে , বিপুল পরিমাণ তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করেছে। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানীরা পৃথক স্বর্ণ পরমাণু পর্যন্ত দেখতে সক্ষম হন। এমনকি সেই পরমাণুর নীচে থাকা গ্রাফিনের জালিকাও দেখা গেছে। তারা লক্ষ করেন, কোন জৈব দ্রাবক ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে স্বর্ণ পরমাণুর আচরণ বদলে যায়। কখনও তারা একা থাকে, কখনও জোড়া বাঁধে, কখনও ছোট গুচ্ছ তৈরি করে। গবেষকরা ১০ লাখেরও বেশি স্বর্ণ পরমাণুর গতিবিধি অনুসরণ করেছেন। এত বিশদভাবে আগে কখনও তরলের ভেতরে পরমাণুর আচরণ পর্যবেক্ষণ করা যায়নি। আসলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির মূল রহস্য লুকিয়ে থাকে কঠিন পদার্থ ও তরলের সংযোগস্থলে। ব্যাটারির ভেতরে চার্জ কীভাবে চলে, অনুঘটক কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়া দ্রুত করে, ফিল্টার কীভাবে কণা আটকায়- এসবই এই জায়গায় ঘটে। এখন বিজ্ঞানীরা যদি সরাসরি সেই স্তরে কী ঘটছে তা দেখতে পান, তবে নতুন উপাদান ও উন্নত যন্ত্র তৈরির পথ অনেক সুগম হবে।

 

সূত্র: Physics World; April 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 8 =