পঞ্চেন্দ্রিয় নয়, ত্রিশেন্দ্রিয়!

পঞ্চেন্দ্রিয় নয়, ত্রিশেন্দ্রিয়!

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ মে, ২০২৬

চিরকাল শুনে এসেছি, মানুষের পাঁচটি ইন্দ্রিয়। চোখে দেখি, কানে শুনি, জিভে স্বাদ পাই, নাকে গন্ধ নিই আর ত্বকে স্পর্শ বুঝি। ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলতে আমরা মূলত ইন্দ্রিয়াতীতকে বুঝে এসেছি। কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়। বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, মানুষের ইন্দ্রিয় পাঁচটি নয়, তিরিশেরও বেশি হতে পারে। তাঁরা বলছেন, আমরা পৃথিবীকে শুধু পাঁচটি পথে অনুভব করি না। বরং শরীরের অনেক ধরনের অনুভূতি একসঙ্গে কাজ করে আমাদের অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। আপনি যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন, খাবার খাচ্ছেন, বা চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছেন, তখনও শরীরের নানা সংবেদন সক্রিয় থাকে। ধরুন, চোখ বন্ধ করেও আপনি নিজের নাক ছুঁতে পারেন। কীভাবে সম্ভব? কারণ আপনার শরীরে আছে ‘প্রোপ্রিওসেপশন’ নামের এক বিশেষ অনুভূতি। এটি আপনাকে বলে দেয়, হাত-পা কোথায় আছে, কোন দিকে নড়ছে। আবার কখনও হঠাৎ খিদে পেলে বা বুক ধড়ফড় করলে বুঝতে পারেন খুব ক্লান্ত লাগছে। এটাও এক ধরনের ইন্দ্রিয়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ইন্টারোসেপশন। অর্থাৎ শরীরের ভেতরে চলছে, তার খবরই আপনাকে দেয় এই সংবেদন। এবার ভাবুন, আপনি সাইকেল চালাচ্ছেন বা ভিড় বাসে দাঁড়িয়ে আছেন, তবু ভারসাম্য হারাচ্ছেন না। এর পেছনে কাজ করছে ভেস্টিবুলার সেন্স। কানের ভেতরের বিশেষ অংশ শরীরের ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করছে। শুধু তাই নয়, আমাদের মস্তিষ্ক জানে এই হাত-পা আমাদেরই, এবং আমরা নিজেই এগুলো নাড়াচ্ছি। এই অনুভূতিকেও বিজ্ঞানীরা আলাদা সংবেদন হিসেবেই দেখছেন।

এবার আসি স্পর্শে। আমরা সাধারণত ভাবি, স্পর্শ মানে শুধু ছোঁয়া। কিন্তু না, ব্যথা, গরম-ঠান্ডা, চাপ, চুলকানি-সবই আলাদা আলাদা অনুভূতি। অর্থাৎ স্পর্শ নিজেই এক বিশাল জগৎ। খাবারের স্বাদ নিয়েও ভুল ধারণা আছে। আপনি ভাবছেন আম বা স্ট্রবেরির স্বাদ জিভে ধরা পড়ে? না, পুরোটা পড়েনা। আসলে খাবারের ‘ফ্লেভার’ বা গন্ধ তৈরি হয় জিভ, নাক আর মুখের অনুভূতি মিলিয়ে। তাই সর্দি হলে খাবারের স্বাদ কম লাগে। আরও আশ্চর্য তথ্য আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিমানের ভেতরের শব্দ, মিষ্টি আর নোনতা স্বাদ কমিয়ে দেয়। তাই অনেকের কাছে প্লেনে টমেটো জুস বেশি ভালো লাগে। আবার হাঁটার সময় পায়ের শব্দ বদলে দিলে মানুষ নিজেকে হালকা বা ভারী মনে করতে পারে। অর্থাৎ শুধু শব্দও শরীরের অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে বলা চলে মানুষকে শুধু “পঞ্চেন্দ্রিয়যুক্ত প্রাণী” বললে ভুল হবে। আমাদের শরীর আসলে এক বিস্ময়কর সংবেদন-যন্ত্র, যেখানে একসঙ্গে কাজ করে অসংখ্য অনুভূতি। তাই পরের বার যখন আপনি কিছু খাবেন, হাঁটবেন, বা চোখ বন্ধ করে দাঁড়াবেন- একবার ভাববেন আপনার ভেতরে ঠিক কতগুলো ইন্দ্রিয় কাজ করছে !

 

সূত্র: Theory of everything; April; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − nine =