পারমাণবিক বিস্ফোরণ বা ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর আকাশে ছড়িয়ে পড়ে তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা, যাকে ‘নিউক্লিয়ার ফলআউট’/ তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপ বলা হয়। এই কণাগুলো তৈরি হয় যত কীভাবে? আর কীভাবেই বা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে? এবং এসব কণার রাসায়নিক গঠন কীভাবে পরিবর্তিত হয়? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া পারমাণবিক ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি লরেন্স লিভারমোর ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির (LLNL) বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন অন্তর্দৃষ্টি তুলে ধরেছেন। তাদের গবেষণার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে ‘অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রি’ জার্নালে।
বিজ্ঞানীরা এমন একটি পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা তৈরি করেন, যা পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর সৃষ্ট তেজস্ক্রিয় কণার সৃষ্টির পরিবেশকে অনুকরণ করতে সক্ষম। বাস্তবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের মুহূর্তে তাপমাত্রা কয়েক হাজার ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছায়, যার ফলে আশপাশের ধাতু, মাটি ও অন্যান্য উপাদান মুহূর্তেই বাষ্পে পরিণত হয়। পরে সেই অতিগরম বাষ্প দ্রুত ঠান্ডা হতে শুরু করলে ক্ষুদ্র তেজস্ক্রিয় কণার জন্ম হয়, যা বাতাসে ভেসে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।
এই জটিল প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য গবেষকেরা একটি বিশেষ প্লাজমা ফ্লো রিঅ্যাক্টর ব্যবহার করেন। পরীক্ষায় তাঁরা ইউরেনিয়াম, সেরিয়াম ও সিজিয়ামের মতো উপাদানের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন এবং দেখতে পান যে এই তেজস্ক্রিয় অবক্ষেপের গঠন নির্ভর করে মূলত তাদের তাপীয় পরিস্থিতির ওপর। অর্থাৎ উপাদানগুলো কতক্ষণ উচ্চ তাপমাত্রায় থাকে এবং কী গতিতে ঠান্ডা হয় তার ওপর।
গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, ইউরেনিয়াম ও সেরিয়াম তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘনীভূত হয়ে কঠিন কণায় রূপ নেয়। কিন্তু সিজিয়াম দীর্ঘ সময় বাষ্পীয় অবস্থায় থেকে যায়। এর ফলে সিজিয়াম অন্য উপাদানের সঙ্গে আরও বেশি রাসায়নিক ক্রিয়া বিক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত এই তেজস্ক্রিয় কণার গঠন ও বৈশিষ্ট্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করে।
এই আবিষ্কার প্রচলিত অনেক ফলআউট মডেলের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। এতদিন বহু মডেলে ধরে নেওয়া হতো যে প্রতিটি উপাদান প্রায় স্বাধীনভাবে আচরণ করে। কিন্তু নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, বাস্তবে তাপমাত্রা কমার সময় উপাদানগুলোর মধ্যে জটিল রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে, যা ফলআউটের চূড়ান্ত গঠন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই নতুন তথ্য ভবিষ্যতের পারমাণবিক অবক্ষেপ মডেলকে আরও বাস্তবসম্মত ও নির্ভুল করে তুলতে পারে। এর ফলে পারমাণবিক বিস্ফোরণ বা রিঅ্যাক্টর দুর্ঘটনার পর তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ বিশ্লেষণ, দূষণের বিস্তারের পূর্বাভাস এবং জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ আরও কার্যকর হবে।
ভবিষ্যতে এই গবেষক দলটি এর থেকেও জটিল ও বাস্তবসম্মত উপাদানের মিশ্রণ নিয়ে পরীক্ষা চালাতে চায়, যাতে বাস্তব পারমাণবিক ঘটনায় অবক্ষেপ তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও বিস্তারিতভাবে বোঝা যায়।
সূত্র: Rakia Dhaoui et al., “Thermal Gradient Effects on Redox Evolution and Volatility-Driven Fractionation in Ternary U/Ce/Cs Condensates,” Analytical Chemistry (2026); Lawrence Livermore National Laboratory
