পারমাণবিক যুগ: উত্থান, যুদ্ধ ও মানবতার সতর্কবার্তা

পারমাণবিক যুগ: উত্থান, যুদ্ধ ও মানবতার সতর্কবার্তা

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৪ জুলাই, ২০২৬

আচ্ছা, পারমাণবিক বোমার ইতিহাস কি কেবলই একটি বিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির কাহিনী? নাকি একে মানব সভ্যতার সবচেয়ে অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক সাফল্য এবং সবচেয়ে ভয়াবহ নৈতিক সংকটের সমান্তরাল ইতিহাস বলা যায় ? কণাপদার্থবিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক ক্লোজ তাঁর ‘Destroyer of Worlds: The Deep History of the Nuclear Age 1895–1965’ গ্রন্থে এই দুই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছেন। বইটি আধুনিক পারমাণবিক যুগের জন্ম, বিকাশ এবং তার নৈতিক অভিঘাতের এক গভীর ও প্রাঞ্জল বিবরণ। এই বইটির শিরোনাম নেওয়া হয়েছে রবার্ট ওপেনহাইমার-এর সেই বিখ্যাত উক্তি থেকে, যা তিনি ১৯৪৫ সালের ট্রিনিটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করার পর ভগবদ্গীতা থেকে উদ্ধৃত করেছিলেন—“এখন আমি মৃত্যু, বিশ্ব বিনাশকারী।” ক্লোজের এই বইটি ওপেনহাইমার বা ম্যানহাটন প্রকল্পের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রায় সাত দশকজুড়ে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, যুদ্ধ, রাজনীতি এবং মানবিক দ্বন্দ্বের এক অসাধারণ ইতিহাস সহজ ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছে।

ক্লোজ দেখিয়েছেন, পারমাণবিক যুগের সূচনা কোনো একক আবিষ্কারের ফলে হয় নি; এটি বহু বিজ্ঞানীর ধারাবাহিক অনুসন্ধান, কৌতূহল এবং যুগান্তকারী আবিষ্কারের সম্মিলিত ফসল। বইটি শুরু হয় ১৮৯৫ সালে উইলহেলম রান্টগেন-এর এক্স-রে আবিষ্কারের মাধ্যমে। এক বছর পর হেনরি বেকেরেলের তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার যেন অদৃশ্য এক নতুন শক্তির দরজা খুলে দেয়। এরপর মারি কুরি ও পিয়ের কুরির রেডিয়াম নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা পারমাণবিক বিজ্ঞানের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করে। ছোট ছোট গবেষণাগারের এইসব পরীক্ষাগুলোই যে একদিন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র তৈরির ভিত্তি হয়ে উঠবে, তখন তা কেউ কল্পনাও করেনি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রা এক ভয়ংকর মোড় নেয়। বইটিতে বিশেষভাবে উঠে এসেছে এনরিকো ফার্মির অসামান্য অবদানের কথা। বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এনরিকো ফের্মি। ফ্যাসিবাদী ইতালি ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি ম্যানহাটন প্রকল্পে যোগ দেন এবং ১৯৪২ সালে বিশ্বের প্রথম কার্যকর পারমাণবিক রিয়্যাক্টর নির্মাণ করেন। আর ১৯৪৫ সালের ট্রিনিটি পরীক্ষার সময় কাগজের ছোট টুকরো বাতাসে ছুড়ে বিস্ফোরণের শক্তি মুহূর্তের মধ্যে অনুমান করার কিংবদন্তিতুল্য ঘটনাটি বিজ্ঞানীদের অসাধারণ পর্যবেক্ষণক্ষমতার প্রতীক হয়ে রয়েছে।

তবে ক্লোজের বই কেবল বৈজ্ঞানিক সাফল্যের গৌরবগাথা নয়; এটি বিজ্ঞানীদের বিবেকের লড়াইয়েরও এক প্রামাণ্য নথি। তিনি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, সব বিজ্ঞানী পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন না। লিও সিলার্ড-এর নেতৃত্বে ৭০ জন বিজ্ঞানী প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান-এর কাছে জাপানের বিরুদ্ধে বোমা ব্যবহার না করার আবেদন জানান। আলবার্ট আইনস্টাইনও এই উদ্যোগকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি ম্যানহাটন প্রকল্পে অংশ নিতে পারেননি এবং আবেদনপত্রে স্বাক্ষরও করেননি। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষিত হয়েছিল; অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হিরোশিমা ও নাগাসাকির উপর পারমাণবিক বিস্ফোরণ বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিল পারমাণবিক শক্তির সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ। ক্লোজ এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান না নিয়ে ইতিহাসকে নিরপেক্ষভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।

বইটিতে ব্রিটেনের গোপন টিউব অ্যালয়স প্রকল্প এবং অটো ফ্রিশ ও রুডলফ পিয়ার্লস-এর মতো অভিবাসী বিজ্ঞানীদের অবদানও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তবে ইউরেনিয়াম-২৩৫ পৃথকীকরণ প্রযুক্তির পথিকৃৎ ফ্রান্সিস সাইমন-এর অবদান তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাওয়ায় সমালোচক কিছুটা আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন।

বইয়ের শেষ অংশে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে হাইড্রোজেন বোমা তৈরির প্রতিযোগিতা, এডওয়ার্ড টেলার ও আন্দ্রেই সাখারভ-এর ভূমিকা এবং ১৯৬৩ সালের আংশিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তির প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে।

এই বইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি পারমাণবিক বোমাকে শুধু একটি সামরিক আবিষ্কার হিসেবে নয়, বরং মানব কৌতূহল, বৈজ্ঞানিক প্রতিভা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, যুদ্ধকালীন আতঙ্ক এবং নৈতিক দায়বদ্ধতার সম্মিলিত পরিণতি হিসেবে ব্যাখ্যা করে। বিজ্ঞান নিজে কখনও ধ্বংসাত্মক নয়; কিন্তু মানুষের সিদ্ধান্তই তাকে সভ্যতার রক্ষাকবচে অথবা বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর বিশ্ববিধ্বংসী শক্তিতে পরিণত করতে পারে। তাই এটি শুধু পারমাণবিক যুগের ইতিহাস নয়, মানবসভ্যতার আত্মসমালোচনারও এক অনন্য দলিল।

 

সূত্র: Physics World June 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 2 =