পিভিসি রূপান্তরিত হল ইঞ্জিন অয়েলে 

পিভিসি রূপান্তরিত হল ইঞ্জিন অয়েলে 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ আগষ্ট, ২০২৬

প্লাস্টিক দূষণ কমানোর উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানীরা বরাবরই এমন একটা প্রযুক্তির খোঁজ করে এসেছেন, যেটা প্লাস্টিককে পুনর্ব্যহারযোগ্য করার পাশাপাশি তাকে মূল্যবান পণ্যেও পরিণত করবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেকের গবেষকরা পলিভিনাইল ক্লোরাইড বা পিভিসি-কে উচ্চমানের লুব্রিকেন্ট বা ইঞ্জিন অয়েলের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে রূপান্তরের একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। এই গবেষণাটির বিস্তারিত বিবরণ নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

পিভিসি বিশ্বের বহুল ব্যবহৃত প্লাস্টিকগুলোর একটি। জলের পাইপ, জানালার ফ্রেম, ক্রেডিট কার্ডসহ নানা পণ্যে এটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু পিভিসি পুনর্ব্যবহার করা কঠিন, কারণ এর মধ্যে ক্লোরিন থাকে এবং উৎপাদনের সময় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক সংযোজক মেশানো দরকার হয়ে পড়ে। ফলে ব্যবহারের পর বিপুল পরিমাণ পিভিসি পুনর্ব্যবহৃত না হয়ে শেষ পর্যন্ত ভাগাড়ের আবর্জনার স্তূপের ভিতর জমা হয়।

ভার্জিনিয়া টেকের রসায়নবিদ ও কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার গুলিয়াংগ্রেগ লিউ এবং তাঁর সহকারী গবেষকদল এই সমস্যার একটি অভিনব সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। তাঁদের পদ্ধতি অনুযায়ী পিভিসি বর্জ্যকে একটি দ্রাবকে রাখা হয়। এরপর তাতে অ্যালুমিনিয়াম ট্রাইক্লোরাইড ও আলফা-ওলেফিন যোগ করে মিশ্রণটিকে প্রায় ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১৫৮°F) তিন ঘণ্টা উত্তপ্ত করা হয়। প্রক্রিয়ার শেষে পাওয়া যায় অপেক্ষাকৃত ঘন এক ধরনের লুব্রিকেন্ট/পিচ্ছিলকারক তেল।

এই তেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পলিআলফাওলেফিন (PAO)-এর মতো উপাদান তৈরি করতে পারে, যা আধুনিক সিন্থেটিক লুব্রিকেন্ট ও ইঞ্জিন অয়েলের অন্যতম প্রধান উপাদান। অর্থাৎ, ফেলে দেওয়া পিভিসি-কে শুধু পুনর্ব্যবহারই করা হচ্ছে না, সেটিকে অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যের একটি শিল্পপণ্যে রূপান্তর করাও সম্ভব হচ্ছে।

গবেষণার শুরুটা অবশ্য এতটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রথমদিকে বিজ্ঞানীরা PVC অণুর গঠন পরিবর্তন করে নতুন রাসায়নিক পদার্থ তৈরির চেষ্টা করেন। কিন্তু উৎপন্ন পদার্থটি ছিল নরম, আঠালো ও কিছুটা জেলির মতো—ব্যবহারিক লুব্রিকেন্ট হিসেবে যার কার্যকারিতা যথেষ্ট নয়। তখন লিউর মাথায় আসে, যদি এই পলিমার এত নরম হয়, তবে এর দীর্ঘ অণুশৃঙ্খলকে আরও ছোট অংশে ভেঙে ফেললে কি হয় একবার দেখাই যাক। সেই ধারণাই শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ গবেষণাটির মোড় ঘোরালো।

গবেষকরা পরে তৈরি তেলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালটেকের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করেন। পাশাপাশি বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও বিশ্লেষণ করা হয়।

এই আবিষ্কারের সম্ভাব্য গুরুত্ব দুই দিক থেকে। একদিকে, ভাগাড়ে জমা হওয়া কঠিন ও পুনর্ব্যবহারের অযোগ্য পিভিসি বর্জ্যের নতুন ব্যবহার তৈরি হতে পারে; অন্যদিকে, জীবাশ্ম-নির্ভর পদ্ধতিতে উৎপাদিত লুব্রিকেন্টের বিকল্প হিসেবে বর্জ্য প্লাস্টিক থেকে মূল্যবান কাঁচামাল পাওয়া যেতে পারে। গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো প্রক্রিয়াটিকে আরও পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী এবং বৃহৎ শিল্পপর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। ভবিষ্যতে পুরনো পাইপ, জানালার ফ্রেম বা বাতিল প্লাস্টিক পণ্য শুধু বর্জ্য নয়, ইঞ্জিনের মসৃণ চলার জন্য প্রয়োজনীয় তেলের কাঁচামালও হয়ে উঠতে পারে।

সূত্রঃ “Upcycling of polyvinyl chloride into polyalphaolefin lubricants” by William A. Goddard III, Guoliang Liu,et.al; 5th August 2026, published in ‘Nature’.

DOI: 10.1038/s41586-026-10867-z

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 + 17 =