পুরুলিয়ার লোকবিশ্বাস ও হায়না সংরক্ষণ

পুরুলিয়ার লোকবিশ্বাস ও হায়না সংরক্ষণ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ আগষ্ট, ২০২৬

বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি থাকলেই যে মানুষ সেই প্রাণী সম্পর্কে ভালোভাবে জানবে, তা নয়। বরং প্রাণীটিকে কতটা দেখা যায় এবং তার আচরণ কতটা চোখে পড়ে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করে মানুষ তার সম্পর্কে কী জানে, কতটা সঠিক জানে। সংরক্ষণবিষয়ক জার্নাল অরিক্স-এ প্রকাশিত, হিউম্যান অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যালায়েন্স লিগ-এর গবেষক বসুধা মিশ্রের এক নতুন গবেষণা পুরুলিয়ার ডোরাকাটা হায়না-কে ঘিরে এমনই এক চিত্র তুলে ধরেছে।

পুরুলিয়ার দুটি ব্লকে বসুধা এবং তাঁর দল ১০৪ জন গ্রামবাসীর সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে গবেষণাটি চালান। গ্রামবাসীদের পাঁচটি মাংসাশী প্রাণীর ছবি দেখিয়ে, তাদের পরিচয়, খাদ্যাভ্যাস, বাসস্থান ও আচরণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তালিকায় ছিল চিতাবাঘ, সোনালি শেয়াল, বেঙ্গল ফক্স, ভারতীয় ধূসর নেকড়ে এবং ডোরাকাটা হায়না। তাতে দেখা যাচ্ছে, চিতাবাঘ, সোনালি শেয়াল ও বেঙ্গল ফক্সকে অধিকাংশ মানুষ সহজেই চিনতে পারলেও ডোরাকাটা হায়নাকে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছেন মাত্র ৩৯ শতাংশ। ১০৪ জনের মধ্যে ২৮ জন প্রাণীটির কোনও নামই বলতে পারেননি এবং জানিয়েছেন, তাঁরা এলাকায় এটিকে দেখেননি। আরও ২৫ জন হায়নাকে অন্য কোনও প্রাণী হিসেবে শনাক্ত করেন। প্রসঙ্গত পুরুলিয়ায় মূলত ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক ঝোপঝাড়, শুষ্ক প্রান্তিক বনাঞ্চল, পাথুরে এলাকা এবং বনঘেরা পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতে এই ডোরাকাটা হায়না দেখা যায়। জেলার বাঘমুন্ডি, ঝালদার শিখর পাহাড়, গড়পঞ্চকোট এবং পাখি পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় এই প্রাণীর উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে চোখেও পড়েছে।

মানুষের মধ্যে হায়না সম্পর্কে জ্ঞানের ঘাটতির অন্যতম কারণ তার জীবনযাপন। একাকী, নিশাচর ও অমিশুক হওয়ায় মানুষের সঙ্গে তার সরাসরি দেখা হওয়ার সুযোগ কম। বিপরীতে, সোনালি শেয়াল বা বেঙ্গল ফক্সকে বসতির আশপাশে কিছুটা বেশি দেখা যায় এবং গৃহপালিত প্রাণীর সঙ্গে তাদের সংঘাতও বেশি। ফলে দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ থেকে তাদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা স্পষ্ট হয়েছে। হায়নার ক্ষেত্রে সেই জায়গা নিয়েছে গল্প, লোকবিশ্বাস ও বিরল ভয়ের অভিজ্ঞতা। হায়নাকে চিনতে পারা ৪৪ জনের মধ্যে ৩৩ জন তাকে ‘গাধা’ এবং ১১ জন ‘কুইয়া’ নামে উল্লেখ করেন। ‘গাধা’-র বর্ণনা বাস্তব ডোরাকাটা হায়নার সঙ্গে অনেকটাই মেলে। বড়, নিশাচর, জঙ্গলে থাকা, একা বা জোড়ায় চলা। তবে এঁদের মতে প্রাণীগুলি মৃত প্রাণীর মাংস খায়। অন্যদিকে ‘কুইয়া’-কে লোককথায় ভয়ংকর ও শক্তিশালী দলবদ্ধ শিকারি হিসেবে বর্ণিত, যে নাকি মানুষ, গবাদি পশু এমনকি হাতিকেও আক্রমণ করতে পারে। অথচ এই প্রাণী সম্পর্কে কথা বলা অধিকাংশ মানুষই তাকে কখনও দেখেননি। গবেষকদের মতে, বিরল কোনও নেতিবাচক মানব-হায়না সংঘাতের ঘটনা পুরনো লোকবিশ্বাসের সঙ্গে মিশে ‘কুইয়া’-র এই ভয়ংকর পরিচয়কে আরও শক্তিশালী করেছে।

হায়নার মৃতদেহ খাওয়ার স্বভাব নিয়েও মানুষের ধারণায় রয়েছে দ্বন্দ্ব। গ্রামের বাইরে মৃত গবাদি পশুর দেহ সরিয়ে ফেললে তাকে পরিবেশ পরিষ্কার রাখার উপকারী প্রাণী হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বসতির কাছে মৃতদেহ খেলে তৈরি হয় ভয় ও বিরক্তি। কবর খুঁড়ে মৃতদেহ খাওয়ার গল্প এই ভয়কে আরও বাড়িয়েছে এবং তা মৃতের আত্মার শান্তি, পরিবারের সম্মান ও অমঙ্গলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তাই হায়না সংরক্ষণে শুধু ক্ষতিপূরণ বা গবাদি পশু রক্ষার ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভয়, লোকবিশ্বাস ও ভুল ধারণাগুলিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। স্থানীয় জ্ঞানকে সম্মান করার পাশাপাশি, কোনটি বাস্তব আর কোনটি লোকবিশ্বাস- সেটিও স্পষ্ট করা জরুরি। এজন্য স্থানীয় কৃষ্টির কথা মাথায় রেখে অডিও-ভিজ্যুয়াল সচেতনতা কর্মসূচির মাধ্যমে হায়নার প্রকৃত আচরণ সম্পর্কে মানুষকে জানানো যেতে পারে।

 

সূত্র: Down to Earth; August, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven + sixteen =